বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

মজুরি বনাম রাজনীতির খেয়াঘাট: শিল্পাঞ্চল যখন রণক্ষেত্র, সরকার তখন ‘ডিসেম্বর ফোবিয়ায়’

✍ লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন। প্রকাশিত: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০৫ এএম
মজুরি বনাম রাজনীতির খেয়াঘাট: শিল্পাঞ্চল যখন রণক্ষেত্র, সরকার তখন ‘ডিসেম্বর ফোবিয়ায়’

তৈরি পোশাক খাতে চলমান ব্যাপক শ্রমিক অসন্তোষ, কল-কারখানা বন্ধ এবং ঢাকা ও এর চারপাশের শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তৈরি হয়েছে এক অচল অবস্থা। তবে শ্রমিকের বকেয়া মজুরি ও নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই সংকটময় মুহূর্তে শ্রমিকের মৌলিক দাবি-দাওয়াকে গুরুত্ব না দিয়ে রাজনৈতিক দায় চাপানোর প্রবণতাই তীব্র হয়ে উঠেছে। শ্রমিকের বেঁচে থাকার লড়াইকে "রাজনৈতিক ভূত" বা "ষড়যন্ত্র" হিসেবে আখ্যা দেওয়ার এই অপচেষ্টা দেশের সার্বিক সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তুলছে।

শিল্পাঞ্চলে রণক্ষেত্র: মজুরি বৃদ্ধির যৌক্তিক দাবি ও উৎপাদনে ধস

গত কয়েকদিন ধরে ঢাকার মিরপুর, আশুলিয়া, গাজীপুর এবং নারায়ণগঞ্জসহ প্রধান প্রধান পোশাক শিল্পাঞ্চলগুলো কার্যত আন্দোলন ও সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালে সর্বশেষ নির্ধারিত মজুরি কাঠামো এবং বর্তমান বাজারদরের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা ১৪০ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

তবে বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে এই সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে:

• কারখানা বন্ধ: বিজিএমইএ-এর তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৬৭০টি সদস্য কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে ১৬ লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ থেকে বঞ্চিত।

• সরকারের আগাম তথ্যের ঘাটতি: আন্দোলন ও গোলযোগের পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সময়মতো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

• মালিকপক্ষের অপরাগতা: শিল্প মালিকদের একাংশ বলছেন বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একলাফে এই পরিমাণ মজুরি বাড়ানো তাদের পক্ষে কষ্টসাধ্য।

কিন্তু জীবনের ন্যূনতম মান নিশ্চিত করার এই গণদাবিকে যখন প্রশাসনিক স্থবিরতার কারণে সঠিক উপায়ে সামাল দেওয়া যায় না, তখনই শুরু হয় অন্য রাজনীতি।

রাজনৈতিক দায় চাপানোর সংস্কৃতি: অন্তর্বর্তীকালীন আমল থেকে বিএনপি সরকার

বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুরোনো ও পরিচিত প্রবণতা হলো যেকোনো সামাজিক কিংবা বাণিজ্যিক আন্দোলনকে প্রতিপক্ষের "ষড়যন্ত্র" বলে চিহ্নিত করা। চব্বিশের বিভিন্ন আন্দোলন, যেমন আনসার সদস্যদের চাকরির স্থায়ীকরণ ও রেস্ট প্রথা বাতিলের দাবি—সব কিছুতেই যেমন তৎকালীন ইউনুস সরকার ও তার সমর্থকরা ‘আওয়ামী লীগের ভূত’ খুঁজে পেত, ঠিক তেমনি বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারও একই পথ ধরে হেঁটেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শ্রমমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট দাবি করা হয়েছে যে, পোশাক খাতের অস্থিরতার পেছনে ‘তৃতীয় পক্ষ’ বা বিগত সরকারের সুবিধাভোগী কিছু শিল্প মালিকের ইন্ধন রয়েছে। পাশাপাশি, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে সরকারকে অস্থিতিশীল করার ছক আঁকা হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক এই জুজু দেখানোর আড়ালে প্রকৃত শ্রমিকের ক্ষোভ ও পেটের ক্ষুধাকে ঢাকা ফেলার চেষ্টা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে।

দিল্লির তৎপরতা ও ‘ডিসেম্বর ফোবিয়া’: শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঘিরে রাজনীতি সরকারের মধ্যে "ডিসেম্বর ফোবিয়া" আরও তীব্র হওয়ার কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে দিল্লি থেকে আসা খবরগুলো। সূত্রমতে, দিল্লিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সম্প্রতি সাবেক সংসদ সদস্য, ইউরোপ থেকে আসা আইনজীবী ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

• দেশে ফেরার সম্ভাব্য তারিখ: আগামী ডিসেম্বরের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে এবং সে সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক দিনক্ষণ ঘোষণা হতে পারে বলে জোর গুঞ্জন রয়েছে।

• কর্মসূচির তোড়জোড়: নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে সর্বাত্মক প্রতিরোধ আন্দোলন ও মাঠপর্যায়ে তৎপরতা বাড়ানোর জন্য তাদের পক্ষ থেকে নির্দেশ গেছে বলে জানা গেছে।

• সরকারের অবস্থান: সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আইনি প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং কোনো বিচারবহির্ভূত মব করা হবে না।

কিন্তু এসব রাজনৈতিক সমীকরণ ও ডিসেম্বরের ভৌতিক আশঙ্কার দোলাচলে আসল ধাক্কাটা এসে পড়ছে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি—তৈরি পোশাক খাতের ওপর।

ভূতের ভয় দেখিয়ে কি ক্ষুধা মেটে? জীবনযাত্রার চরম ব্যয়বৃদ্ধি এবং সম্প্রতি পুনরায় এলপিজি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পর সাধারণ শ্রমিকের সংসার চালানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের স্পষ্ট কথা—যা বেতন পাওয়া যায়, তা দিয়ে বর্তমানের আকাশছোঁয়া বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব।

রাজনীতিতে ডিসেম্বরের হিসাব-নিকাশ বা দলীয় তৎপরতা থাকতে পারে, কিন্তু শিল্প খাতের অস্থিরতাকে শুধু ‘আওয়ামী লীগের ফিরতি ভূত’ কিংবা ‘রাজনৈতিক ইন্ধন’ বলে উড়িয়ে দিলে সংকটের মূল সমাধান হবে না। প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে সামলানো সরকারের কাজ হতে পারে, কিন্তু সেই দোহাই দিয়ে রাজপথে নামা ক্ষুধার্ত শ্রমিকের পেটের ক্ষুধা মেটানো সম্ভব নয়। কারখানাগুলোর চাকা সচল রাখতে এবং দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে জুজুর ভয় দেখানো বন্ধ করে অবিলম্বে শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা ও বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার নিশ্চিত করতেই হবে।

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: