মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

স্বাস্থ্য

তৃতীয় পর্ব: ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা

লিখেছেন: অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক ডিন, মেডিসিন অনুষদ, বিএসএমএমইউ। প্রকাশিত: ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:২০ পিএম
তৃতীয় পর্ব: ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা

ডেঙ্গু জ্বরের কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষেধক ওষুধ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি এবং বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গুর যে কয়েকটি ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে, সেগুলোর কার্যকারিতা নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক ও শারীরিক শর্তের ওপর নির্ভরশীল। তাই ডেঙ্গুর হাত থেকে বাঁচতে হলে একমাত্র ও প্রধান হাতিয়ার হলো সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা। ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষাকালের রোগ নয়, সারা বছরই এর উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। ফলে প্রতিরোধ কর্মসূচীও হতে হবে বছরব্যাপী।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ প্রক্রিয়াটিকে মূলত দুটি মূল স্তম্ভে ভাগ করা যায়: ১. এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করা এবং মশা দমন। ২. মশার কামড় থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করা। ১. প্রজননক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ ও ধ্বংসের কৌশল

এডিস মশা অত্যন্ত সতর্ক ও গৃহপালিত এক প্রজাতির মশা, যা প্রধানত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। একটি এডিস মশা প্রতিবার শত শত ডিম পাড়তে পারে এবং সেই ডিম পানির অভাব হলেও মাসের পর মাস শুষ্ক অবস্থায় টিকে থাকতে পারে। পরবর্তীতে পানির স্পর্শ পেলেই তা থেকে লার্ভা ও মশায় পরিণত হয়। বাসাবাড়ি ও আঙিনা পরিষ্কার:

• বাসাবাড়ির বারান্দা, ছাদ, ফুলের টব, ফুলদানি, এসি ও ফ্রিজের ড্রেন ট্রে, অব্যবহৃত পাত্র, প্লাস্টিকের ক্যান, মাটির হাঁড়ি এবং নারকেলের খোসা নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। কোনো স্থানে যেন ৩ থেকে ৫ দিনের বেশি পানি জমে না থাকে।

• নির্মাণাধীন ভবন ও বহুতল ভবন: নির্মাণাধীন ভবনের কিউরিং এর পানি, লিফটের গর্ত, বেজমেন্ট এবং পার্কিং এলাকায় প্রচুর এডিস মশা বংশবৃদ্ধি করে। এসব স্থানে নিয়মিত ব্লিচিং পাউডার বা কেরোসিন ছিটানো অথবা জমে থাকা পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়।

• প্রতিষ্ঠান ও উন্মুক্ত স্থান: স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি অফিস, নার্সারি, রেস্তোরাঁ ও দোকানের চারপাশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। ছাদবাগানের টব ও বাঁশের খুঁটির গায়ে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা জরুরি।

• পরিত্যক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: রাস্তায় বা খোলা জায়গায় পড়ে থাকা ডাবের খোসা, টায়ার, চিপসের প্যাকেট ও পলিথিন নিয়মিত অপসারণ করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিধনে স্প্রে (Adulticiding) এবং লার্ভা ধ্বংসে লার্ভিসাইড (Larviciding) প্রয়োগ করতে হবে।

২. ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে মশার কামড় থেকে সুরক্ষার উপায় মশার কামড় থেকে নিজেকে বাঁচাতে প্রতিটি নাগরিককে নিজস্ব সচেতনতা বাড়াতে হবে:

• মশারির সার্বক্ষণিক ব্যবহার: দিনে বা রাতে যখনই ঘুমানো হোক না কেন, অবশ্যই টাঙানো মশারি ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ করে ছোট শিশু ও বৃদ্ধদের ঘুমানোর সময় মশারির ভেতর রাখা নিশ্চিত করতে হবে।

• উপযুক্ত পোশাক পরিধান: বাইরে বের হওয়ার সময় বা স্কুলে যাওয়ার সময় শিশুদের ফুলহাতা জামা, ফুলপ্যান্ট এবং পা ঢাকা জুতা-মোজা পরানো উচিত, যাতে শরীরের উন্মুক্ত অংশ কম থাকে।

• গৃহস্থালি সুরক্ষা ব্যবস্থা: ঘরের জানালা ও দরজায় মশারোধী নেট (Insect Net) লাগানো উচিত। ঘরে মশা তাড়ানোর রিপেলেন্ট স্প্রে, কয়েল, ভেপ বা রেসপিরেটরি ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে।

সমন্বিত প্রশাসনিক ও সামাজিক উদ্যোগ

ডেঙ্গু একটি সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যা। কেবল প্রশাসনের একার পক্ষে বা কেবল মশক নিধন কর্মীদের স্প্রে ছিটিয়ে কোটি কোটি মানুষের এই দেশে ডেঙ্গু নির্মূল করা সম্ভব নয়। এটি রোধে প্রয়োজন ব্যক্তি সচেতনতা ও সরকারি কাঠামোর একটি সুদৃঢ় অংশীদারত্ব। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি ওয়ার্ডে মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ (Entomological Survey), নিয়মিত প্রজননস্থল শনাক্তকরণ এবং সমন্বিত মশক বিনাশ কর্মসূচি (Integrated Mosquito Management) জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করার জন্য গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচারণা ও সামাজিক ড্রাইভ পরিচালনা করা আবশ্যক।

একইভাবে, প্রতিটি নাগরিককে 'আমার বাড়ি, আমার দায়িত্ব'—এই নীতি মেনে নিজের বসতভিটা ও কর্মক্ষেত্র পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ কেবল একজন ব্যক্তির বা কোনো একক সংস্থার নয়, বরং এটি একটি জাতীয় লড়াই। প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং জনগণের আন্তরিক সচেতনতার সম্মিলিত রূপই পারে বাংলাদেশকে একটি টেকসই ডেঙ্গুমুক্ত নিরাপদ পরিবেশ উপহার দিতে।

লেখক: অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক ডিন, মেডিসিন অনুষদ, বিএসএমএমইউ।