এক দিনে ১৬টি প্রদীপ নিভে গেল: বিষাদ আর আতঙ্কে নিভৃত স্বজনদের হাহাকার
একদিকে জ্বরের ঘোরে কাঁপতে থাকা স্বজন, অন্যদিকে একটুখানি আশ্রয়ের আশায় এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটোছুটি—দেশের বাতাসে এখন যেন কেবলই মৃত্যু আর বিষাদের গন্ধ। আজ সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুটি পৃথক তথ্য গোটা দেশকে থমকে দিয়েছে। ডেঙ্গুর ছোবলে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ৮ জন মানুষ, আর অন্যদিকে অবুঝ, নিষ্পাপ ৮টি শিশু ঢলে পড়েছে হামের কোলে। একদিনেই দেশের আকাশে নিভে গেল ১৬টি তাজা প্রদীপ। যে কোলে আজ হাসিমুখে ওঠার কথা ছিল ছোট্ট শিশুদের, সেই কোল এখন কেবলই খালি আর শুন্য। যে পরিবারে সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বালানোর কথা ছিল, সেখানে আজ কেবলই স্বজন হারানোর আর্তনাদ আর কান্নার রোল। এই দুটি রোগ দেশের ঘরে ঘরে হানা দিয়ে কেড়ে নিচ্ছে পরম প্রিয় মানুষদের।
ডেঙ্গুর নির্মম থাবা: ১৫৭টি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি
২৪ ঘণ্টার পরিসংখ্যানে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৭ ৩৩ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী। বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি প্রান্তে এখন কেবল রোগীদের বাঁচার আকুতি। এই নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫৭ জনে। আর আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে দিন কাটাচ্ছেন মোট ৫৩ হাজার ৫৭০ জন মানুষ। হাসপাতালের শয্যায় ছটফট করতে থাকা প্রিয় মানুষটির পাশে বসে থাকা স্বজনদের চোখে এখন কোনো ঘুম নেই—আছে কেবল আশঙ্কার জল আর সৃষ্টিকর্তার কাছে নিঃশব্দ প্রার্থনা।
হামের ছোবল: নিষ্পাপ শিশুদের নিঃশব্দ বিদায়
মৃত্যুর এই করুণ মিছিলে যোগ হয়েছে হাজারো শিশুর কান্না। ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা ও সিলেটে প্রাণ হারিয়েছে ৮টি নিষ্পাপ শিশু। এই বছর হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে পৌঁছেছে ১ হাজার ৩০ জনে। পরিসংখ্যান বলছে, কেবল ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৭৭ জন নতুন করে উপসর্গ নিয়ে শয্যাশায়ী হয়েছে, আর এখন পর্যন্ত সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার। শিশুরা বোঝে না ব্যাধির জটিলতা, তারা কেবল চেনে মা-বাবার কোল। কিন্তু সেই কোলেই যখন নেমে আসে অন্ধকারের স্তব্ধতা, তখন কোনো সান্ত্বনাই আর অশ্রু থামাতে পারে না। প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে লুকিয়ে আছে একেকটি ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, একেকটি অসম্পূর্ণ গল্প আর সারাজীবনের জন্য শোকের সাগরে ভেসে যাওয়া এক-একটি পরিবার। মহামারী আর ব্যাধির এই ভয়াবহ দিনগুলোতে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এবং স্বাস্থ্যসচেতনতাই হতে পারে আমাদের একমাত্র ঢাল। আমাদের আর কোনো প্রদীপ নিভতে দেওয়া চলবে না; আমাদের প্রার্থনা, এই বিষাদের মেঘ কাটিয়ে ফিরে আসুক সুস্থ ও নিরাপদ একটি প্রবাত।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
তপ্ত শ্বাসের শহর: নীরব মহামারীর: কোলে শায়িত শৈশব: ঘরে ঘরে জ্বরের অনল
অনাগত স্বপ্নের অকালমৃত্যু: মায়ের সাথে অনাগত সন্তানের বিদায়: ১৪৩ মৃত্যু ও স্তব্ধ শত ঘর : ৫০ হাজার আক্রান্তের মিছিলে
মশার কামড়ে বিপন্ন জীবন: গ্রাম থেকে শহরে ডেঙ্গু ও হামের জোড়া থাবায় হাসপাতালে হাহাকার। সীমিত চিকিৎসা ব্যবস্থা,কম আইসিইউ এবং সচেতনতার অভাবে প্রান্তিক জনপদে বাড়ছে মানবিক বিপর্যয়