তপ্ত শ্বাসের শহর: নীরব মহামারীর: কোলে শায়িত শৈশব: ঘরে ঘরে জ্বরের অনল
রাজধানীর যান্ত্রিক ধাতব পথ ধরে প্রতিদিনের মতো ট্রেনের ঝনঝনাট। যাতায়াতের পথেই লুকিয়ে থাকে কোনো এক অদৃশ্য বিষাদ। উত্তরা থেকে মতিঝিলগামী মেট্রোর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরায় মা আর ছোট্ট মেয়েটি হয়তো একে অপরের হাত ধরে বাড়ি ফিরছিল, কিন্তু সেই রাতের শেষটা সুন্দর হলো না। ঘরে ফেরামাত্রই মায়ের কপাল আর ছোট্ট দেহটিতে ছড়িয়ে পড়ল এক তীব্র উত্তাপ। দুদিন পর মায়ের গায়ের জ্বর কিছুটা নামলেও, দশ বছরের মেয়েটির তপ্ত নিশ্বাস থামেনি। তার ওপর আবার কোলজুড়ে থাকা চার বছরের অবুঝ ছোট শিশুটিরও গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে।
আজ কেবল এক পরিবারের গল্প নয় এটি; দেশের প্রতিটি ঘরের একই আর্তনাদ। চার দেয়ালের আড়ালে এখন বাস করছে অদৃশ্য আতঙ্ক। যেন আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে মরণব্যাধি। যে শৈশব দাপিয়ে বেড়ানোর কথা ছিল স্কুলের সবুজ মাঠে, তা আজ ধুঁকছে এক তীব্র যন্ত্রণায়।
শ্যামলীর শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে ভোরের আলো ফুটতেই এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। কোলে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা নিষ্পাপ মুখগুলো, কারও চোখ ভিজে উঠছে ব্যথায়, কেউ বা মায়ের কাঁধে মাথা রেখে শেষ আশ্রয় খুঁজছে। সারি সারি লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লান্ত বাবা-মায়ের চোখেমুখে চরম হাহাকার আর অনিশ্চয়তার ছাপ। হাসপাতালের করিডোরজুড়ে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ আর কাশির শব্দ মিশে তৈরি হয়েছে এক থমথমে পরিবেশ। চিকিৎসকদের ব্যস্ত হাতে প্রতিদিন যে ঘরে ২০০-২৫০টি বাচ্চার চিকিৎসা হতো, আজ সেখানে দ্বিগুণ আর্জি। বহির্বিভাগ থেকে জরুরি বিভাগ—সবখানেই শুধু ছোট্ট জীবনের আকুতি।
পাঁচ বছরের পুতুল সাধিয়ার গাল আর গলা ফুলে উঠেছে দুদিন ধরে। এক ফোঁটা পানিও মুখে তুলতে পারছে না সে। মা ভেবেছিলেন হয়তো সাধারণ টনসিলের ব্যথা, কিন্তু হাসপাতালের ঠান্ডা সাদা ঘরে ডাক্তারের পরীক্ষার পর উঠে এলো অন্য সত্য—শিশুটির কোমল শরীর আঁকড়ে ধরেছে মামস ভাইরাস। প্রতিটি দরজায় এমন শত শত গল্প, যা হৃদয়কে এক নিমেষে চূর্ণ করে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা যেন এক নিঃশব্দ মহামারীর আগাম সংকেত। ইনফ্লুয়েঞ্জা, টাইফয়েড, মামস, কিংবা কনজাংটিভাইটিসে আক্রান্ত হয়ে চোখ-মুখ লাল করে কাঁপা কাঁপা শরীরে মায়েরা ধরে রাখছেন তাঁদের রক্তমাংসের টুকরোদের। সবচেয়ে বড় কাল his হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেঙ্গু আর হাম। গরমের উত্তাপের সাথে সাথে এই নিঃশব্দ ঘাতক ডেঙ্গু প্রতিদিন কাড়ছে প্রাণ। কেবল চলতি মাসের প্রথম তেরো দিনেই পাঁচটিরও বেশি ডজন প্রাণ নিভে গেছে বাতাসে, যার এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে আমাদের মায়েরা আর নিষ্পাপ শিশুরা।
হামের মতো ছোঁয়াচে ব্যাধি ছড়াচ্ছে দাবানলের মতো। গত ২৪ ঘণ্টাতেও যখন থার্মোমিটারের পারদ উঁচুতে উঠছে, তখন কত মা হারালেন তাঁর বুকের মাণিককে। গত কয়েক মাসে হামের লক্ষণে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি শিশু। নিশ্চিত হামে শত শিশুর জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ার পরিসংখ্যান শুধুই এক গাণিতিক হিসাব নয়, এর পেছনে রয়েছে শত শত মায়ের কোল খালি হওয়ার করুণ ইতিহাস।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বারবার তাগিদ দিচ্ছেন আইসোলেশনের, মুখে কিছুটা স্যালাইন আর পুষ্টিকর তরল খাবার তুলে দেওয়ার জন্য। কারণ, ভুল চিকিৎসায় কিংবা ব্যথানাশক ওষুধের অসচেতন ব্যবহারে একটু ভুল হলেই চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে ঘরের পুতুলটি। কিন্তু সাধারণ মানুষের অসহায়তা আর ভিড় ঠেলে কজন আর পাচ্ছেন সঠিক সময়ে সেই চিকিৎসা?
নাক দিয়ে পানি পড়া, গা-হাত-পা কামড়ে তীব্র ব্যথা, কিংবা শরীরে ছোট ছোট লাল র্যাশ—এসব সাধারণ উপসর্গ আজ এক গভীর অমঙ্গল সংকেত হয়ে দেখা দিয়েছে। ঘর থেকে গণপরিবহন, সব জায়গাতেই আজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এক চরম ভীতি। আমাদের অবহেলা আর পরিস্থিতির সমীকরণ যেন রূপ নিয়েছে এক চরম মানবিক বিপর্যয়ে।
প্রতিটি রাতের আঁধারে আজ কত শত মা-বাবা শিশুর কপালে ঠাণ্ডা জলের পট্টি দিতে দিতে নীরবে চোখের জল ফেলছেন। কোনো ওষুধের শিশি বা প্রেসক্রিপশন যেন এই ভয়াল উত্তাপের উপশম করতে পারছে না। জ্বর আর ব্যাধির এই মরণজালে আটকা পড়ে আমাদের প্রিয় সন্তানরা আজ বেঁচে থাকার লড়াই করছে। এ এক এমন এক সময়, যখন প্রদীপ নেভার আগেই সচেতনতার আলো জ্বালানো প্রতিটি নাগরিকের পরম কর্তব্য।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
এক দিনে ১৬টি প্রদীপ নিভে গেল: বিষাদ আর আতঙ্কে নিভৃত স্বজনদের হাহাকার
অনাগত স্বপ্নের অকালমৃত্যু: মায়ের সাথে অনাগত সন্তানের বিদায়: ১৪৩ মৃত্যু ও স্তব্ধ শত ঘর : ৫০ হাজার আক্রান্তের মিছিলে
মশার কামড়ে বিপন্ন জীবন: গ্রাম থেকে শহরে ডেঙ্গু ও হামের জোড়া থাবায় হাসপাতালে হাহাকার। সীমিত চিকিৎসা ব্যবস্থা,কম আইসিইউ এবং সচেতনতার অভাবে প্রান্তিক জনপদে বাড়ছে মানবিক বিপর্যয়