অনাগত স্বপ্নের অকালমৃত্যু: মায়ের সাথে অনাগত সন্তানের বিদায়: ১৪৩ মৃত্যু ও স্তব্ধ শত ঘর : ৫০ হাজার আক্রান্তের মিছিলে
একটি নামহীন ছোট্ট ঘর। সেখানে রঙিন জামা কাপড় আর ছোট্ট জুতো সাজিয়ে রাখা হয়েছিল গভীর ভালোবাসায়। আগামী মাসেই পৃথিবীতে আসার কথা ছিল এক নতুন অতিথির, প্রথমবার 'মা' ডাক শোনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন পাথরঘাটার শিক্ষিকা ২৬ বছর বয়সী অর্পিতা দাশ। কিন্তু এক অদৃশ্য কামড়, একটুখানি জ্বর আর রক্তে প্লাটিলেটের দ্রুত পতন—সব স্বপ্নকে চুরমার করে দিল মুহূর্তে। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের যান্ত্রিক শব্দ আর চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টার মাঝেও ধরে রাখা গেল না তাকে। মায়ের থমকে যাওয়া হৃৎস্পন্দনের সাথে সাথে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল গর্ভে থাকা সেই নিষ্পাপ শিশুটির স্পন্দনও। একটি পরিবার যেখানে নতুন প্রাণের আগমনী সুর শোনার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই হাহাকার আর মাতম।
এই করুণ দৃশ্য কেবল একটি পরিবারের নয়, আজ পুরো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এমন হাজারও বেদনার গল্প। এডিস মশার কামড়ে একের পর এক নিভে যাচ্ছে তাজা প্রাণ, স্বজনহারাদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে দেশের বাতাস। প্রতিদিন হাসপাতালের বারান্দায়, আইসিইউয়ের সামনে ভিড় করছেন দিশেহারা মানুষ। মৃত্যুর এই মিছিল যেন থামতেই চাইছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে ৫০ হাজার ২৭৬ জনে পৌঁছেছে। আর এই মারণব্যাধিতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪৩ জন মানুষ। হিসাবের খাতায় এরা শুধুই সংখ্যা, কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে এক একটি পরিবার, থমকে যাওয়া এক একটি ভবিষ্যৎ। মৃতদের তালিকায় রয়েছে এক অবুঝ শিশুও, যার বয়স ছিল মাত্র ছয় থেকে ১০ বছরের মধ্যে। খাতা-কলমে নারী ও পুরুষের মৃত্যুর হার প্রায় সমান হলেও, এই মৃত্যুর ধাক্কা সামলাতে গিয়ে একেকটি পরিবার পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।
চলতি বছরের প্রথম কয়েকটা মাস পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত থাকলেও, বর্ষা আসার পর থেকেই ডেঙ্গুর গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং আগস্টে ৪৩ জনের প্রাণহানির পর সেপ্টেম্বর মাস যেন আরও বেশি নির্মম হয়ে উঠেছে। এই চলতি মাসেই এখন পর্যন্ত ৪৬ জন মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। কেবল ৮ সেপ্টেম্বর একদিনেই সর্বোচ্চ ৯ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ হাজার ৫৭১ জন রোগী।
রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও, এই বিষাক্ত থাবা এখন সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। খুলনা, ময়মনসিংহ, বরিশাল এবং চট্টগ্রামেও বাড়ছে ডেঙ্গুর তাণ্ডব। চট্টগ্রামে সম্প্রতি প্রসূতি অর্পিতা দাশের করুণ মৃত্যু পুরো নগরীকে শোকস্তব্ধ করে দিয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের ডেথ রিভিউ ও কাগজপত্রের জটিলতায় হয়তো অনেকের নাম পরিসংখ্যানে দেরিতে যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু হাসপাতালের আইসিইউ থেকে শুরু করে সাধারণ ওয়ার্ডে মানুষের জীবন-মৃত্যুর লড়াই থামছে না।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ঠাঁই পেয়েছেন ১ হাজার ৫৬ জন মানুষ। এ পর্যন্ত ৪৬ হাজার ৬৯৯ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও হাসপাতালগুলোর ওয়ার্ডে এখনও কাতরাচ্ছেন হাজার হাজার রোগী। স্যালাইনের বোতল ঝোলানো স্ট্যান্ড আর রক্ত সংগ্রহের আকুতি নিয়ে স্বজনদের ছোটাছুটি—এটাই এখন দেশের অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের নিত্যদিনের চিত্র।
কেবল পরিচ্ছন্নতার সরকারি ঘোষণা বা পরিসংখ্যানের খাতা দিয়ে এই কান্না থামানো সম্ভব নয়। এডিস মশার হাত থেকে রক্ষা পেতে ব্যক্তিগত সচেতনতা আর সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে না তুললে, এই অকাল মৃত্যুর মিছিল কোথায় গিয়ে থামবে, তা কেউ জানে না। কত অনাগত প্রাণ এভাবে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই ঝরে যাবে, কত মা তার সন্তানকে হারাবে—সেই উত্তর দেওয়ার মতো আজ কেউ নেই।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
এক দিনে ১৬টি প্রদীপ নিভে গেল: বিষাদ আর আতঙ্কে নিভৃত স্বজনদের হাহাকার
তপ্ত শ্বাসের শহর: নীরব মহামারীর: কোলে শায়িত শৈশব: ঘরে ঘরে জ্বরের অনল
মশার কামড়ে বিপন্ন জীবন: গ্রাম থেকে শহরে ডেঙ্গু ও হামের জোড়া থাবায় হাসপাতালে হাহাকার। সীমিত চিকিৎসা ব্যবস্থা,কম আইসিইউ এবং সচেতনতার অভাবে প্রান্তিক জনপদে বাড়ছে মানবিক বিপর্যয়