বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

সংবাদ পর্যালোচনা

যে রক্তের দাগ মোছা যায় না চুনকামে: এনায়েতপুরের সেই অভিশপ্ত বিকেল, ১৫টি তাজা প্রাণ ও আজও অধরা অস্ত্রের আতঙ্ক ।

লিখেছেন: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন প্রকাশিত: ৫ আগস্ট ২০২৬, ৯:২৪ এএম
যে রক্তের দাগ মোছা যায় না চুনকামে: এনায়েতপুরের সেই অভিশপ্ত বিকেল, ১৫টি তাজা প্রাণ ও আজও অধরা অস্ত্রের আতঙ্ক ।

ইটের তৈরি দেয়ালগুলোকে হয়তো নতুন রঙের চাদরে মুড়ে দেওয়া যায়, আগুনে পোড়া কালো দাগ মুছে ফেলা যায় চুনকাম করে। কিন্তু যে মাটি বিষাদ আর বিভীষিকার রক্ত শুষে নিয়েছিল, যে বাতাস ভেসে গিয়েছিল অসহায় মানুষের আর্তনাদে—সেখানকার ক্ষত কি সহজে শুকায়?

দুই বছর পেরিয়ে গেছে। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার সেই ভয়াল ৪ আগস্টের ট্র্যাজেডি আজও মানুষের মনে অমলিন, তাজা এবং অত্যন্ত আতঙ্কের। এক অভিশপ্ত বিকেলে এনায়েতপুর থানায় নির্মম হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৫ জন পুলিশ সদস্য। সহিংসতার সেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছিল থান ভবন, লুট হয়েছিল বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র।

আজ এত দিন পরও নতুন রঙের প্রলেপ দেওয়া থানা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে স্তূপীকৃত পোড়া যানবাহনগুলোর দিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়। তার চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয়—সেদিন লুট হওয়া প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনও নিখোঁজ, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অন্ধকারের কোন এক অজানা গহ্বরে।

তীব্র আক্রমণের মুখে যখন প্রাণের কোনো আশা ছিল না, পুলিশ সদস্যরা দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে প্রাণ বাঁচানোর আকুতি নিয়ে ছুটতে থাকেন। কেউ ছাদের ওপর, কেউবা ছাদের পানির ট্যাংকের ভেতরে আশ্রয় নেন। সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী মাইকে আহ্বান জানানোর পর ছাদের পানির ট্যাংক থেকে অর্ধমৃত অবস্থায় বেরিয়ে আসেন ৯ থেকে ১০ জন পুলিশ সদস্য।

এক চিলতে আশ্রয়ের খোঁজে: উঠান, পুকুর আর নিথর দেহ

থানার পেছনের ভেঙে পড়া সীমানা প্রাচীর পেরিয়ে জীবন বাঁচাতে পাশের সাধারণ তাঁতশ্রমিকদের বাড়িগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য। ষাটোর্ধ্ব বাবলু তাঁতির উঠান সেদিন পরিণত হয়েছিল এক মর্মান্তিক মৃত্যুপুরীতে।

অশ্রুসজল চোখে বাবলু তাঁতি স্মরণ করেন, "আমার বাড়ির বাথরুমে এসে ১০-১২ জন পুলিশ সদস্য লুকিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সেখান থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে এনে বাড়ির উঠানেই পিটিয়ে মারা হয়। তৎকালীন ওসির লাশ ফেলে দেওয়া হয় কাছের পুকুরে। চারপাশে শুধু রক্ত আর বস্ত্রহীন লাশ..."

মানুষের এমন নির্মমতার সাক্ষী হয়ে বাবলু তাঁতির স্ত্রী মঞ্জুয়ারা খাতুন আজ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। ঘটনার সেই বিভীষিকা তাকে এমনভাবে তাড়া করে যে, প্রায় ছয় মাস ধরে নিজের ভিটাবাড়িতে দিনের বেলায় ফিরতে পারেননি তিনি। ভয় আর আতঙ্ক আজও তার প্রাত্যহিক সঙ্গী; নিয়মিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে তাকে।

তবে এই অন্ধকারের মাঝেও মানবতা একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি। বাবলু তাঁতি ও তার পরিবারের মানুষেরা যখন দেখলেন তিন-চারজন আঘাতপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য তখনও কোনোরকমে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন, তখন ভয়কে জয় করে তারা এগিয়ে এসেছিলেন। নিজেদের কাপড় দিয়ে তাদের শরীর ঢেকে, গোপন পথে নিরাপদে তাদের পৌঁছে দিয়েছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ে।

ক্ষতের ওপর রঙের প্রলেপ, তবুও সুপ্ত অস্ত্রের আতঙ্ক

এনায়েতপুর থানাটি কিছুদিন পরিত্যক্ত থাকার পর দীর্ঘ সংস্কার কাজ শেষে আবারও পুরোনো ভবনে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু করেছে। নতুন রঙের প্রলেপে মুছে ফেলা হয়েছে আগুনের কালচে দাগ। কিন্তু মামলার আলামত হিসেবে এক কোণে জমে থাকা মোটরসাইকেল আর পিকআপের কঙ্কালগুলো নীরবে সাক্ষী দিচ্ছে সেই নৃশংসতার।

তদন্ত কর্মকর্তা ও এনায়েতপুর থানার এসআই ফরিদ উদ্দিন জানান, সেই তাণ্ডবের দিনে থানা থেকে পাঁচটি পিস্তল, চায়না রাইফেল, শর্টগান, গ্যাস গান এবং বিপুল পরিমাণ গুলি ও গ্যাস শেল লুট করা হয়েছিল। দীর্ঘ তদন্তের পরও এখনও লুট হওয়া একটি রাইফেল, চারটি পিস্তল ও একটি শটগান উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

একই দিনে আক্রান্ত হওয়া হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানা থেকেও ২৫টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল, যার মধ্যে এখনও ৮টি অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি বলে নিশ্চিত করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা মনোজিত কুমার নন্দী। এই নিখোঁজ অস্ত্রগুলো কোথায়, কার হাতে রয়েছে—তা নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন সচেতন মহল।

এনায়েতপুর থানা ভবনের দেওয়ালগুলো হয়তো নতুন করে প্রাণ পেয়েছে, সেখানে ডিউটি অফিসার বসেন, নাগরিক সেবা দেওয়া হয়। তবে সিরাজগঞ্জের সেই মাটির বুক থেকে কি মুছে ফেলা যাবে চার আগস্টের সেই রক্তচিহ্ন? নাকি নিখোঁজ অস্ত্রের নীরব হুমকিতে এখনও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে না এলাকাবাসী? উত্তর খোঁজার চেষ্টা আজও অব্যাহত।

লেখক: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন, প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা