রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

সংবাদ পর্যালোচনা

রক্তের দাগে রাজনীতির অঙ্ক: 'জুলাই' ঘটনাপঞ্জি ও একটি মানবিক জিজ্ঞাসার ব্যবচ্ছেদ

লিখেছেন: এ কে আব্দুল মোমেন প্রকাশিত: ৭ আগস্ট ২০২৬, ৩:৫৬ পিএম
রক্তের দাগে রাজনীতির অঙ্ক: 'জুলাই' ঘটনাপঞ্জি ও একটি মানবিক জিজ্ঞাসার ব্যবচ্ছেদ

ইতিহাসের পাতায় কিছু সময় আসে যা একটি জাতির দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, অনুভূতি এবং রাজনৈতিক গতিপথকে পুরোপুরি বদলে দেয়। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং তৎপরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাবলী বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনই এক চরম বিতর্কিত ও সংবেদনশীল অধ্যায়। নিহতদের তালিকা নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা, রাজনৈতিক ক্ষমতার মারপ্যাঁচ এবং সাধারণ মানুষের মৃত্যুর পরিসংখ্যান—সব মিলিয়ে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন আজ সাধারণ জনগণের মনে। 'জুলাই' কি সত্যিই একটি গণজাগরণ ছিল, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ?

১. প্রাণহানির পরিসংখ্যান ও তালিকার ধোঁয়াশা আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে প্রাণহানির যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তা নিয়ে শুরু থেকেই নানা বিতর্ক বিদ্যমান: • জাতিসংঘের প্রাথমিক প্রতিবেদন ও বাস্তব চিত্র: প্রাথমিক অবস্থায় জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ১৪০০ জনের প্রাণহানির কথা বলা হলেও পরবর্তীতে তা কমিয়ে ৮৪১ জনে আনা হয়। • গোয়েন্দা সংস্থার যাচাই-বাছাই: ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই)-এর তথ্যমতে, চূড়ান্তভাবে মাত্র ৩১৪ জনের নাম ও মৃত্যুর সঠিক তারিখ সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। • ভৌগোলিক এককেন্দ্রিকতা: ঢাকার মাত্র পাঁচটি নির্দিষ্ট এলাকায় (উত্তরা ৭০+, মিরপুর ৬২, রামপুরা ৩২, যাত্রাবাড়ী ১১৭) মোট ৩২৪ জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও, এই তালিকার সঠিক পোস্টমর্টেম ও পূর্ণাঙ্গ পরিচয় এখনও স্পষ্ট নয়। • শনাক্তহীন মৃতদেহ: রায়েরবাজারে 'জুলাই যোদ্ধা' পরিচয়ে ১১৪ জনকে দাফন করা হলেও গত দুই বছরে মাত্র ৯ জনের স্বজন পরিচয় সনাক্ত করতে পেরেছেন। বাকি ১০৫ জনের পরিবারের খোঁজ না মেলা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়।

২. ৫ ও ৬ আগস্টের মৃত্যুর হিসাব: কার স্বার্থে এই রক্তপাত? দৈনিক প্রথম আলোসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাণহানির ধরণ ও রাজনৈতিক পরিচয় অত্যন্ত জটিল:

• ৫ ও ৬ আগস্টের সহিংসতা: আন্দোলনের ৩৬ দিনের মধ্যে শেষ দুই দিনেই (৫ ও ৬ আগস্ট) ২১৫ জন মানুষ প্রাণ হারান। প্রশ্ন ওঠে, তৎকালীন সরকারপ্রধানের দেশত্যাগের পর এই বিশাল সংখ্যার মানুষ কাদের হাতে এবং কী উদ্দেশ্যে নিহত হলেন? • নিহতদের দলীয় পরিচয়: প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নিহতদের মধ্যে মাত্র ২৩ জন ছিলেন শিক্ষার্থী এবং ১২ জন বিএনপি কর্মী। বিপরীতে ৮৭ জন সরকারি দলের (আওয়ামী লীগ) কর্মী এবং ৩৬ জন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। • ক্ষমতার সমীকরণ: রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দখলে থাকা সত্ত্বেও কীভাবে সরকারপক্ষের নিহত মানুষের সংখ্যা (১২৩ জন) বিরোধী পক্ষের (৩৫ জন) চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হলো, তা এক বড় রাজনৈতিক ধাঁধা।

৩. শিশুদের নীরব কান্না ও নিরীহ মানুষের প্রাণহানি রাজনীতি যখন হিংস্র রূপ নেয়, তখন সবচেয়ে বড় শিকার হয় নিরপরাধ মানুষ ও শিশুরা: • শিশু হত্যা ও রহস্য: আন্দোলনে শিশুসহ প্রায় ৭০ জন কোমলমতি প্রাণ হারিয়েছে, যারা রাজনীতির জটিল সমীকরণ বোঝার বয়সে পৌঁছায়নি। • নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক পরিচয়হীন মৃতদেহ: মোট হিসাবের ১৬৮ জনের কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না। এই নিরীহ মানুষদের ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ ও সহিংসতায় জড়িতদের মুখোশ আজও উন্মোচিত হয়নি।

৪. পরিবর্তন-পরবর্তী শাসন ও নতুন স্বৈরাচারের রূপরেখা

আন্দোলন-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা দেশে শান্তিসৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কতটা সক্ষম হয়েছে, তা নিয়ে অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলার বর্তমান চিত্র হতাশাজনক:

• মব ভায়োলেন্স ও বিচারহীনতা: ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও 'মব জাস্টিস'-এর নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের সংস্কৃতি চালু হয়েছে, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়। • সাম্প্রতিক সহিংসতা: সাম্প্রতিক সময়েও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ ও পারস্পরিক সংঘর্ষে বহু মানমানুষ হতাহত হচ্ছে। সংবাদপত্র সূত্রে জানা যায়, রাজনৈতিক কোন্দল ও গণপিটুনিতে প্রতিনিয়ত নিরীহ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীরা প্রাণ হারাচ্ছেন। • জনস্বাস্থ্যের চরম বিপর্যয়: প্রশাসনিক স্থবিরতার কারণে সঠিক সময়ে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় হাজার হাজার শিশু হামসহ প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুমুখী হচ্ছে—যা নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, একটি মানবিক বিপর্যয়।

৫. 'জুলাই' নাটক নাকি ক্ষমতার নতুন খেলা?

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সাধারণ মানুষের দাবি—মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ইতিহাসকে একপাশে ঠেলে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং দেশীয় কিছু গোষ্ঠীর পারস্পরিক আঁতাতে এই পটপরিবর্তন ঘটিত হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন।

প্রকৃতির বিচার অবধারিত

ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। সাময়িক রাজনৈতিক সুযোগ নিয়ে জনগণের চোখকে হয়তো কিছুদিনের জন্য অন্ধ করে রাখা যায়, কিন্তু সত্যকে চিরতরে চেপে রাখা অসম্ভব। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে জাতির জন্ম, সেই জাতি আঘাত সহ্য করতে করতে একসময় ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায়।

জনগণের নামে পরিচালিত ছদ্মবেশী রাজনীতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং নিরীহ মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষমতার গদি কখনো স্থায়ী হতে পারে না। রাজনৈতিক ক্ষমতার এই লড়াইয়ে আজ যারা জয়ী মনে করছে, প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম বা "Retribution of Nature"-এর মুখোমুখি তাদের হতে হতেই হবে। সত্যের পুনরুত্থান এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ঘুরে দাঁড়ানোই হবে এই দেশের রাজনীতির চূড়ান্ত ও অবধারিত পরিণতি।

লেখক: এ কে আব্দুল মোমেন, রাজনীতিবিদ,সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী