শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

একটি ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান: কাঠগড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসন ও সরকার

লিখেছেন: এ বি এম কামরুল হাসান, প্রবাসী চিকিৎসক ও কলামিস্ট প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৩৭ পিএম
একটি ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান: কাঠগড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসন ও সরকার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের এ আর তাহসিন জাহান ২০২৩ সালের স্নাতক পরীক্ষায় ৪.০০-এর মধ্যে ৩.৯৫ সিজিপিএ অর্জন করে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন। সেই অসাধারণ কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর ডিনস অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করার কথা ছিল। অথচ চার বছরের কঠোর পরিশ্রম, অসংখ্য নির্ঘুম রাত আর মেধার বহুল আকাঙ্ক্ষিত সেই স্বীকৃতিই তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

কেন?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাহসিনের নিজের বক্তব্য থেকে তাঁর এই সিদ্ধান্তের কারণটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর প্রত্যাখ্যান কোনো পুরস্কারের বিরুদ্ধে নয়; বরং এমন এক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, যেখানে একজন শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর শিক্ষার অধিকার, এমনকি তাঁর নিরাপত্তাও নির্ধারণ করতে পারে।

তাহসিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তিনি মবের আক্রমণের শিকার হন। কোনো সহিংসতায় সম্পৃক্ত না থাকা সত্ত্বেও নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েই হুমকির মুখে পড়েন। তাঁকে চূড়ান্ত মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে এবং স্নাতক থিসিস জমা দিতে বাধা দেওয়া হয়। একপর্যায়ে নিজের নিরাপত্তার জন্য ক্যাম্পাসে ফেরাও তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।

তাঁর বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক তখন সাহস করে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের সহযোগিতায় নিরাপদ স্থান থেকে অনলাইনে মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে তিনি স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে হার্ভার্ডে উচ্চশিক্ষার সুযোগও পেয়েছেন।

তাহসিন ভাগ্যবান। কিন্তু যাঁরা পারেননি?

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বহু শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, বাম কিংবা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করতে পারেন। অপরাধ করলে তাঁর বিচার হবে—প্রচলিত আইনে, আদালতে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় কি কারও ক্লাসরুমে প্রবেশের অধিকার কেড়ে নেওয়ার লাইসেন্স হতে পারে?

যদি মব ঠিক করে কে ক্যাম্পাসে ঢুকবে, কে পরীক্ষা দেবে আর কে নিরাপদে থাকবে—তাহলে উপাচার্য, প্রক্টর, সিন্ডিকেট আর প্রশাসন আছে কেন?

বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বিজয়ী রাজনৈতিক শক্তির দখলি সম্পত্তি নয়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে যদি শুধু নিপীড়ক ও নিপীড়িতের পরিচয় বদলায়, তাহলে তাকে পরিবর্তন বলা যায় না। গতকাল রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে নির্যাতন করা অন্যায় হলে আজ একই কাজ কীভাবে ন্যায়সংগত হয়ে যায়?

তোফাজ্জল, মাসুদ ও শামীমের মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, মব সংস্কৃতি একটি সমাজকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে। মবের হাতে মানুষ আক্রান্ত বা নিহত হওয়ার পর শোকবার্তা দিয়ে প্রশাসনের দায়িত্ব শেষ হয় না। মবকে প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য সব সময় তাকে প্রকাশ্যে সমর্থনও করতে হয় না—তার অন্যায়ের সামনে নীরব থাকাই কখনো কখনো যথেষ্ট।

সরকারের দায় আরও বড়। ২০২৪-এর পরিবর্তন যদি সত্যিই গণতন্ত্র, বৈষম্যহীনতা ও ন্যায়বিচারের জন্য হয়ে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষাঙ্গন থেকে বিচ্ছিন্ন শিক্ষার্থীরা আজও কেন নির্বিঘ্নে ফিরতে পারছেন না? সরকার কেন দ্ব্যর্থহীনভাবে নিশ্চিত করতে পারছে না—অপরাধের বিচার হবে আদালতে, ক্যাম্পাসের মবের কাছে নয়?

একজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে পুরস্কার দেওয়া সহজ। তাঁর ফলাফলের পাশে ৩.৯৫ লিখে সম্মাননা দেওয়াও সহজ। কঠিন কাজ হলো, সেই শিক্ষার্থী যখন সংখ্যাগরিষ্ঠের অপছন্দের মানুষ হয়ে ওঠেন, তখনও তাঁর অধিকার রক্ষায় দাঁড়ানো।

তাহসিনের ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গৌরবের সংবাদ নয়; বরং আত্মজিজ্ঞাসার উপলক্ষ। যে প্রতিষ্ঠান একজন শিক্ষার্থীর মেধাকে পুরস্কৃত করতে চায়, সেই প্রতিষ্ঠানকেই সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে তাঁর শিক্ষার অধিকার ও নিরাপত্তা।

আর যাঁরা বলেন, “আমরাই বিকল্প, আমরাই পরিবর্তন”, তাঁদেরও মনে রাখা দরকার—ক্ষমতার চেয়ার বদলানো, নিপীড়কের মুখ বদলানো কিংবা নিপীড়িতের পরিচয় বদলানোর নাম পরিবর্তন নয়।

মবের পরিচয় বদলালে মব ন্যায়বিচার হয়ে যায় না। অন্যায়ের শিকার বদলালে অন্যায় বৈধ হয়ে যায় না। ন্যায়বিচার যদি আমার প্রতিপক্ষের জন্যও না থাকে, তবে আমার জন্য যেটুকু থাকে—তার নাম ন্যায়বিচার নয়; তার নাম সুবিধা।

লেখক: এ বি এম কামরুল হাসান, প্রবাসী চিকিৎসক ও কলামিস্ট

সম্পর্কিত সংবাদ

সোনারবাংলার দিগন্তে কৃষিবিপ্লব: বাংলাদেশর পাঁচ বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কালজয়ী যাত্রা। যান্ত্রিকীকরণ ও প্রযুক্তির সোনালী স্পর্শ

সোনারবাংলার দিগন্তে কৃষিবিপ্লব: বাংলাদেশর পাঁচ বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কালজয়ী যাত্রা, দ্বিতীয় পর্ব: বিজ্ঞানের স্পর্শে বদলানো ফসলের মাঠ

সোনারবাংলার দিগন্তে কৃষিবিপ্লব: বাংলাদেশ পাঁচ বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কালজয়ী যাত্রা প্রথম পর্ব: শূন্যতার বুক চিরে স্বপ্নের পুনর্জন্ম