সোনারবাংলার দিগন্তে কৃষিবিপ্লব: বাংলাদেশর পাঁচ বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কালজয়ী যাত্রা, দ্বিতীয় পর্ব: বিজ্ঞানের স্পর্শে বদলানো ফসলের মাঠ
মাটির রঙে যার বুক রাঙানো, রোদে পোড়া আর বৃষ্টিতে ভেজা যে কৃষকের শ্রমে গড়ে ওঠে বাংলার অস্তিত্ব, সেই কৃষকের চোখে দীর্ঘকাল কেবল অনিশ্চয়তার ছায়া লেগে থাকত। প্রকৃতির খেয়ালিপনা, খরা আর বন্যার সাথে যুদ্ধ করে ফসল হারানো ছিল তাদের নিত্যদিনের ভবিতব্য। কিন্তু সেই করুণ দিনগুলোর চাকা ঘুরে যায় এক দূরদর্শী নেতৃত্বের হাত ধরে। এক সময়ের সনাতনী কৃষিতে আধুনিক বিজ্ঞানের স্পর্শ দিয়ে দেশের প্রান্তিক কৃষকের স্বপ্নকে নতুন করে জাগিয়ে তোলেন এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসেন বাংলাদেশের পাঁচ বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি মর্মে মর্মে জানতেন, এ দেশের সীমিত জমি আর জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকা বিপুল জনসংখ্যার অন্নসংস্থান চিরাচরিত প্রথায় কখনোই সম্ভব নয়। ক্ষুধামুক্ত ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার অদম্য বাসনায় গবেষণাকেই তিনি বানান তাঁর প্রধান হাতিয়ার। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতার দায়িত্ব নিয়েই শুরুতেই তিনি ১২ কোটি টাকা স্রেফ কৃষি গবেষণার জন্য বরাদ্দ করেন—যা ছিল বাংলার কৃষি ইতিহাসে বিজ্ঞানকে আপন করে নেওয়ার এক যুগান্তকারী সূচনা। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ২০০৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কৃষিবিজ্ঞানীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আবিষ্কৃত হয় ৬৩১টি উচ্চফলনশীল জাত এবং ৯৪০টি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি। মাঠে মাঠে বিজ্ঞানের এই আশীর্বাদ ছড়িয়ে পড়তেই শস্যশ্যামলা বাংলা নতুন প্রাণ খুঁজে পায়।
কৃষি গবেষণার এই যুগান্তকারী প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে ফসলের উৎপাদনে। এক নজরে বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় ফসলের অভূতপূর্ব সাফল্যের চিত্র:
ফসলের ধরন ২০০৬ (লাখ মেট্রিক টন) ২০১৮ (লাখ মেট্রিক টন) প্রবৃদ্ধি (%) চাল ২৬৫.৩০ ৩৬২.৭৯ ৩৬.৭৪% গম ৭.৩৫ ১১.৫৩ ৫৬.৭৮% ভুট্টা ৫.২২ ৩৮.৯৩ ৬৪৫.৭৮% শাকসবজি ২০.৩৩ ১৫৯.৫৪ ৬৮৪.৭৫%
জলবায়ু পরিবর্তনের দুর্যোগ যখন বারবার বাংলার বুক ছারখার করে দিতে চায়, তখন বিজ্ঞানের আলোই হয়ে ওঠে কৃষকের রক্ষাকবচ। খরা, আকস্মিক বন্যা ও উপকূলের লবণাক্ততার মতো ভয়াবহ প্রতিকূলতা মোকাবিলায় আবিষ্কৃত হয় 'ব্রি ধান' এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ জিংক ধান। যে মাটিতে একসময় নোনা পানির থাবায় কোনো ফসল ফলত না, কিংবা যে জমি খরার দাহে ফেটে চৌচির হতো, সেখানেও আজ সোনার ধানের শীষ বাতাসের দোলায় সুর তোলে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর আবিষ্কৃত এই জাতগুলো আজ দেশের ৭৫% জমিতে কৃষকের মুখে আনন্দের হাসি ফোটাচ্ছে।
মাটি কেবল ধুলোবালি নয়, মাটি কৃষকের জননী। সেই মাটির উর্বরতা রক্ষা ও সঠিক যত্নের জন্য ভ্রাম্যমাণ গবেষণাগার পৌঁছে দেওয়া হয় একদম গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠো পথে। মাত্র ২৫ টাকায় নিজের খেতের মাটি পরীক্ষা করার ঐতিহাসিক সুযোগ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে কৃষকের একদম গোড়ালি পর্যন্ত। কৃষকের রক্ত জল করা ঘাম যেন আর নিষ্ফল না হয়, সে নিশ্চিত করতেই এই ভালোবাসার আয়োজন।
মেঠো পথের ধুলোমাখা পথ পেরিয়ে আজ বাংলাদেশ চাল, সবজি ও মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিজ্ঞানের যাদুকরী স্পর্শ আর কৃষকের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে এক সূত্রে গেঁথে যিনি বাংলার মাটিকে সোনার খাদে রূপান্তর করেছেন, কৃষকের এই আত্মপরিচয়, অধিকার ও সমৃদ্ধির অনন্য কাণ্ডারী হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে বাংলাদেশের পাঁচ বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম।
লেখক: ড.আওলাদ হোসেন, রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক