সোনারবাংলার দিগন্তে কৃষিবিপ্লব: বাংলাদেশর পাঁচ বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কালজয়ী যাত্রা। যান্ত্রিকীকরণ ও প্রযুক্তির সোনালী স্পর্শ
শেষ পর্ব- মাটির মায়া আর কৃষকের ঘামের গন্ধে গড়ে ওঠা এই পলিদ্বীপে প্রতিটি সকাল আসে নতুন আশার বার্তা নিয়ে। একসময় যে কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রোদ-বৃষ্টিতে বুক ভেঙে কেবল অভাবের হিসাব মেলাতেন, আজ তাঁর চোখেমুখে স্বাবলম্বিতার আনন্দাশ্রু। বাংলার এই চিরায়ত রুপান্তর কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের দেখা 'ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ'-এর সেই অসামান্য রূপায়ণ, যার মূল কারিগর তাঁরই সুযোগ্য কন্যা, বাংলাদেশের পাঁচ বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
যান্ত্রিকীকরণ ও প্রযুক্তির সোনালী স্পর্শ
বাংলার গ্রামগুলোতে একসময় সূর্য ওঠার আগেই শোনা যেত লাঙল-জোয়ালের মড়মড় শব্দ আর ক্লান্ত কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেই কাদামাখা হাতে আজ এসে পৌঁছেছে আধুনিক বিজ্ঞানের আশীর্বাদ। সনাতন পদ্ধতির কঠোর শারীরিক শ্রম লাঘব করতে এবং উৎপাদন খরচ একধাক্কায় কমিয়ে আনতে মাঠপর্যায়ে সূচনা হয়েছে এক নিঃশব্দ প্রযুক্তিবিপ্লবের। কাঠের লাঙলের স্থান দখল করে নিয়েছে শক্ত সমর্থ ট্রাফটর, পাওয়ার টিলার আর সুবিশাল কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার।
এই পরিবর্তন শুধুই যন্ত্রের ব্যবহার নয়, এটি ছিল কৃষকের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার এক মানবিক অঙ্গীকার। হাওড় ও উপকূলীয় দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের কষ্টসহিষ্ণু মানুষের জন্য ৭০ শতাংশ এবং সাধারণ সমতল এলাকায় ৫০ শতাংশ ভর্তুকিমূল্যে আধুনিক কৃষিযন্ত্র পৌঁছে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই বিশাল আর্থিক সহায়তা বহাল রাখার সাহসী সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে—মাঠের মানুষের কষ্ট দূর করাই তাঁর রাজনীতির মূল দর্শন।
ডিজিটাল বাংলাদেশের সোনালী ছোঁয়া আজ মিশে গেছে মাটির গন্ধে। 'রাইস ক্রপ ম্যানেজার', 'ভেজাল সার শনাক্তকরণ অ্যাপ' কিংবা 'Online Fertilizer Recommendation System'-এর মতো উদ্ভাবনগুলো কাদামাখা হাতগুলোর মুঠোয় এনে দিয়েছে বৈজ্ঞানিক সমাধান। কোনো জটিলতা বা ফসলের রোগবালাই দেখা দিলে আর দিশেহারা হতে হয় না; '১৬১২৩' কৃষি কল সেন্টারে একটি ফোনকলই নিমেষে মিলিয়ে দেয় বিশেষজ্ঞদের পরম মমতাভরা পরামর্শ। আজ দেশের আবাদি জমির ৯০ থেকে ৯২ ভাগ এলাকা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির আলোয় আলোকিত হয়ে মাঠের সাধারণ কৃষক আজ এক আত্মবিশ্বাসী ও আধুনিক 'কৃষিযোদ্ধা'।
আত্মনির্ভরতার নতুন দিগন্ত ও পুষ্টির সংগ্রাম
কৃষির এই জয়যাত্রা কেবল শস্যের সোনালী শীষে বন্দি থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়েছে রূপালী জলধারায় এবং গোয়ালের প্রাণিসম্পদে। "ভাতে-মাছে বাঙালি"—বাঙালির প্রাণের এই চিরন্তন অহংকার একসময় বিলুপ্ত হতে বসেছিল। কিন্তু দূরদর্শী নেতৃত্বের জোরে অভ্যন্তরীণ মুক্তজলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে ৩য় এবং বন্ধজলাশয়ে ৫ম স্থানে উঠে এসেছে। নদী ও জলাশয়ে রূপালী মাছের উৎপাদন এক দশকে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৫ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়েছে, যা এককালের খাদ্যপ্রার্থী জাতিকে এনে দিয়েছে রূপালী ঐশ্বর্য।
পুষ্টির সংগ্রাম ছিল আরও করুণ ও কঠিন। ১৯৭১ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে, ১৯৭২ সালে যেখানে জনপ্রতি দুধের প্রাপ্যতা ছিল মাত্র ১৭ মিলিলিটার, তা ২০২০-২১ অর্থবছরে এক রূপকথার মতো লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৩.৩৮ মিলিলিটারে। যে দেশে মাংসের প্রাপ্যতা ছিল দৈনিক মাত্র ৪.৯৭ গ্রাম, তা আজ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৭.৮৪ গ্রামে। আর বছরে যেখানে একজন মানুষের ভাগে মাত্র ৪টি ডিম জুটত, সেখানে আজ পৌঁছানো গেছে ১২১.১৮টিতে। এই সংখ্যাগুলো কেবল গাণিতিক হিসাব নয়; এগুলো একটি পুষ্টিহীন, দুর্বল জাতির ঘুরে দাঁড়িয়ে শক্তিশালী ও সক্ষম হয়ে ওঠার জীবন্ত দলিল।
ক্ষুধামুক্ত, সুখী-সমৃদ্ধ 'সোনার বাংলা' গড়ার যে স্বপ্নের বীজ রোপণ করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, রক্তে ভেজা পথ হেঁটে সেই বীজকে প্রকাণ্ড মহীরুহে পরিণত করেছেন তাঁরই রক্তের উত্তরাধিকারী। খাদ্যঘাটতির দীর্ঘ অভিশাপ আর করুণা চাওয়ার দিন শেষ করে পুষ্টির প্রাচুর্যে বাংলাদেশকে স্বাবলম্বী করার এই যাত্রাপথ অত্যন্ত আবেগঘন ও ঐতিহাসিক। বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো আধুনিক, স্বাবলম্বী বাংলাদেশের প্রতিটি ধানের শীষে, রূপালী মাছের আঁশে আর কৃষকের পরম তৃপ্তির হাসিতে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে শেখ হাসিনার কালজয়ী ভিশনারি নেতৃত্ব।
লেখক: ড.আওলাদ হোসেন, রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সম্পর্কিত সংবাদ
একটি ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান: কাঠগড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসন ও সরকার
সোনারবাংলার দিগন্তে কৃষিবিপ্লব: বাংলাদেশর পাঁচ বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কালজয়ী যাত্রা, দ্বিতীয় পর্ব: বিজ্ঞানের স্পর্শে বদলানো ফসলের মাঠ
সোনারবাংলার দিগন্তে কৃষিবিপ্লব: বাংলাদেশ পাঁচ বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কালজয়ী যাত্রা প্রথম পর্ব: শূন্যতার বুক চিরে স্বপ্নের পুনর্জন্ম