মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

অশ্রু ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা এক অবিনাশী পথচলা: আওয়ামী লীগের জন্ম ও স্বাধীনতার সুর, রক্তের অক্ষরে লেখা ইতিহাস।

লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন। প্রকাশিত: ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:১৭ পিএম
অশ্রু ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা এক অবিনাশী পথচলা: আওয়ামী লীগের জন্ম ও স্বাধীনতার সুর, রক্তের অক্ষরে লেখা ইতিহাস।

পর্ব ১: বাঙালির ইতিহাস কেবল পঞ্জিকার পাতা উল্টানোর গল্প নয়; এ ইতিহাস লাঞ্ছনা, বঞ্চনা আর রক্তস্নাত আত্মত্যাগের এক অমর মহাকাব্য। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরপরই পরাধীনতার নতুন এক শৃঙ্খল চেপে বসেছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাত কোটি মানুষের ওপর। জাতির অস্তিত্বের ওপর প্রথম আঘাতটি এসেছিল মাতৃভাষার ওপর। ১৯৪৮ সালের মার্চে রেসকোর্স ময়দান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে দাঁড়িয়ে যখন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলো, তখন উপস্থিত তরুণ শেখ মুজিবসহ ছাত্রসমাজ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষাকে হরণ করে একটি জাতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার সেই চক্রান্ত বাঙালিদের হৃদয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল।

ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে শাসনের সর্বক্ষেত্রে শুরু হলো চরম বৈষম্য। বাঙালিদের অবহেলা ও নিচু জাত হিসেবে দেখার এই মানসিকতা তৎকালীন দূরদর্শী নেতাদের ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করে তোলে। সেই বঞ্চনার জবাব দিতে এবং অধিকারবঞ্চিত মানুষের সম্মান পুনর্প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন ঢাকার কে এম দাস লেনের ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে জন্ম নেয় ‘আওয়ামী লীগ’। মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আতাউর রহমান খান, শামসুল হক এবং তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে যে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ছিল মূলতঃ বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের রক্তিম সূর্য।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে শেখ মুজিব তাঁর পুরো যৌবনকে সমর্পণ করেছিলেন কারাপ্রকোষ্ঠে। ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রথম কারাবরণ থেকে শুরু করে ১৯৪৮-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৪৯-এর দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ আন্দোলন ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম—প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকার বাতিলের পর আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, কিংবা ১৯৬৪-৬৫ সালের রাজনৈতিক নিপীড়ন—কোনো কিছুই তাঁর লক্ষ্য থেকে তাঁকে সরাতে পারেনি। বাঙালির বাঁচা-মরার দাবি হিসেবে ১৯৬৬ সালে তিনি পেশ করেন ঐতিহাসিক ‘৬ দফা’। এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক দাবি ছিল না, এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ৬৩.৭৭% মানুষের হৃদয়ের আকুতি। যেখানে পূর্ব পাকিস্তানের পাট, চামড়া ও চা থেকে আসা সিংহভাগ অর্জিত আয় পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হতো, সেখানে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে ৬ দফা ছিল বাঙালির জাতীয় ঐক্যের একমাত্র প্রতীক। এই দাবির অপরাধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে দিনের পর দিন ফাঁসির মঞ্চের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছিল। কিন্তু কোটি মানুষের বাঁধভাঙা ভালোবাসার কাছে নতিস্বীকার করে শাসকগোষ্ঠী তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ১০ লক্ষ জনতার সাগরে দাঁড়িয়ে তিনি যখন গর্জে উঠলেন, "২৩ বছরের ইতিহাস রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস... এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম"—তখন প্রতিটি বাঙালি ঘরকে দুর্গ বানিয়েছিল। ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস গণহত্যার পর মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাঁর নির্দেশিত পথেই ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত এবং দুই লক্ষ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে উদিত হয় স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’।

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।