মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

দীপ্ত আলো থেকে শ্মশানের আঁধার: শেখ হাসিনার বিদ্যুতায়ন ও আজকের অন্ধকারে বাংলাদেশ ।

লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন। প্রকাশিত: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম
দীপ্ত আলো থেকে শ্মশানের আঁধার: শেখ হাসিনার বিদ্যুতায়ন ও আজকের অন্ধকারে বাংলাদেশ ।

আগস্ট মানেই যেন বুকের গভীরে জমে থাকা কিছু করুণ হাহাকার, এক রক্তের নদী পার হয়ে আসা শোকাচ্ছন্ন ইতিহাস। কিন্তু আজকের এই আগস্টে সেই শোকের পাল্লা যেন আরও ভারী, আরও তীক্ষ্ণ। যে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা আজ কোন গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে?

শতভাগ বিদ্যুতায়ন ও ৩০ হাজার মেগাওয়াটের অসাধ্য সাধন একসময় যেখানে আলো ছড়িয়ে পড়েছিল প্রান্তিক গ্রাম থেকে দূরবর্তী দ্বীপে, আজ সেখানে চারপাশ ঘিরে ধরেছে নিঃশব্দ হাহাকার। বাংলাদেশের পাঁচবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে অন্ধকার থেকে আলোর দিশা দিয়েছিলেন। দুর্গম এলাকায় সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার অসাধ্য সাধন করেছিলেন তিনি। নদী পার হয়ে সাতশরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিটি ঘরে ঘরে যে আলোর প্রদীপ জ্বালানো হয়েছিল, তা ছিল এক অভূতপূর্ব ইতিহাস। শেখ হাসিনার হাত ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল এবং দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়ন অর্জিত হয়েছিল। ১৯৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে যে আলোর বিপ্লব ঘটেছিল, তার সুবাদে মানুষ 'লোডশেডিং' শব্দটাই ভুলতে বসেছিল।

বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা ও শিল্প অর্থনীতির ভিত

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরম দূরদর্শিতা দিয়ে অনুধাবন করেছিলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ছাড়া এক ইঞ্চিও সামনে এগোনো সম্ভব নয়। ১৯৭৫ সালের আগস্টের সেই অভিশপ্ত দিনের কিছুদিন আগে, অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে শেল কোম্পানির কাছ থেকে পাঁচটি গ্যাসফিল্ড কিনে তিনি দেশের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির ভিত গড়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। আজ আমাদের শিল্পকারখানা, বস্ত্র খাত আর শত বিলিয়ন ডলারের রফতানি অর্থনীতির পেছনে ছিল তাঁরই সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের আলো। পরবর্তীতে একই স্বপ্নের পথ ধরে দুই দশকের কঠোর পরিশ্রমে শেখ হাসিনা সেই ভিত্তিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।

আলোর শহর থেকে অন্ধকারে ফেরা মানুষের হাহাকার অথচ আজ? আলোর সেই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় পার হয়ে দেশ যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছে। যে দেশে একসময় ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ থাকত, আজ সেখানে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা জুড়ে গ্রাস করে থাকে নিরেট অন্ধকার। ভুল নীতি, অব্যवस्था আর অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে জ্বালানি খাত আজ চরম সংকটে। চারপাশের অস্থিতিশীলতায় কলকারখানা আর সার কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনযাত্রায়। পেটে ভাত নেই, ঘরে আলো নেই—বুকচাপা কষ্টে সাধারণ মানুষ আজ পথ হারিয়ে ফেলছে। অগ্নিমূল্যের বাজারের চাপে ও বিদ্যুৎহীন নিশ্বাসের সাথে সামনে ঘনিয়ে আসছে এক অনিশ্চিত দুর্ভিক্ষের ছায়া।

স্মৃতিচিহ্ন অবমাননা ও নৈরাশ্যের চাদর

সবচেয়ে হৃদয়দায়ক বিষয় হলো, জাতির পিতার রক্তে ভেজা এই বাংলায় প্রতিনিয়ত আদর্শের ওপর আঘাত হানা হচ্ছে। তাঁর স্মৃতিচিহ্ন ভাঙার দুঃসাহস দেখিয়ে যেন প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে কতখানি প্রতিহিংসাপরায়ণ মানসিকতা চারপাশে ছেয়ে গেছে। যে দেশে একসময় বিচারহীনতার ইনডেমনিটি দিয়ে সত্যকে স্তব্ধ করা হয়েছিল, আজ আবারও যেন সেই পুরোনো অন্ধকারের পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে। শত শত কর্মীর কান্না, স্বজনহারা পরিবারের আহাজারি আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় আজ পুরো জাতিকে এক গভীর নৈরাশ্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সোনার বাংলার যে বর্ণিল স্বপ্ন বুকে নিয়ে কোটি মানুষ বেঁচে থাকার আলো খুঁজে পেয়েছিল, সেই আলো আজ নিভে যেতে বসেছে। যে দেশ গড়ে উঠেছিল আলো আর স্বপ্নের ওপর, তা কি তবে শ্মশানের নীরবতায় রূপ নেবে? এই চরম সংকটের রাতে দাঁড়িয়েও বাংলার নিপীড়িত মানুষের বিবেক জেগে ওঠার অপেক্ষায়। অন্ধকারের তীব্রতা যতই বাড়ুক না কেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য আর আলোর জয় একদিন হবেই—এই ব্যাকুল আশাই এখন এক বুক হাহাকারের মাঝে একমাত্র সম্বল।

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।