ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তনে বেড়েছে উদ্বেগ, শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
আমাদের দেশে ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালের নির্দিষ্ট কোনো রোগ নয়, বরং এটি সারা বছরের এক আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যেই ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রকৃতি বা ধরনে এসেছে এক বড় ও বিপজ্জনক পরিবর্তন। গত দুই বছর ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের মধ্যে 'ডেন-টু' (DEN-2) সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকলেও, বর্তমানে তার জায়গা দখল করেছে 'ডেন-থ্রি' (DEN-3)। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক alarming তথ্য—বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্তদের প্রায় ৯১ শতাংশের শরীরেই মিলছে ডেন-থ্রি ভাইরাসের উপস্থিতি। ভাইরাসের এই আচমকা পরিবর্তনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান ও বিগত বছরের তুলনামূলক চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনা করলে ডেঙ্গুর এই রূপবদলের স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। বিগত বছরগুলোতে দেশে ডেন-টু ভাইরাসের আধিক্য সবচেয়ে বেশি ছিল।
২০২৪ সালের চিত্র: সে বছর ডেঙ্গু রোগীদের ৭০ ভাগের বেশি মানুষের শরীরে ডেন-টু শনাক্ত হয়েছিল। অন্যদিকে, ডেন-থ্রি আক্রান্তের হার ছিল মাত্র ২০ শতাংশের কিছু বেশি।
২০২৫ সালের চিত্র: এই বছর পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয়। ডেন-টু এর সংক্রমণ কমে দাঁড়ায় ৪৮.৫ ভাগে, আর এর বিপরীতে ডেন-থ্রি এর সংক্রমণ বেড়ে পৌঁছায় ৩৫ শতাংশে।
বর্তমান পরিস্থিতি: সর্বশেষ আইইডিসিআরের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ডেন-থ্রি এখন প্রায় একচ্ছত্রভাবে দাপট কাটাচ্ছে, যা মোট রোগীর ৯১ শতাংশ। ভাইরাসের এমন দ্রুত রূপান্তর চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা ও শারীরিক জটিলতা
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু ভাইরাসের মোট চারটি সেরোটাইপ বা ধরন রয়েছে। কেউ যদি অতীতে ডেঙ্গুর কোনো একটি ধরনে (যেমন: ডেন-টু) আক্রান্ত হয়ে থাকেন এবং পরবর্তীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি ধরনে (যেমন: ডেন-থ্রি) আক্রান্ত হন, তবে তার শরীরে অত্যন্ত গুরুতর জটিলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানে সেকেন্ডারি ইনফেকশন বা অ্যান্টিবডি ডিপেন্ডেন্ট এনহ্যান্সমেন্ট বলা হয়, যা রোগীর রক্তে অনুচক্রিকা বা প্লাটিলেট দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে এবং হেমোরেজিক ফিভার বা রক্তক্ষরণজনিত ডেঙ্গুর মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
জনকল্যাণমূলক সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
ডেঙ্গুর এই নতুন ধরন ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে লড়াই করতে হলে সাধারণ মানুষকে আরও অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। নিচে কিছু জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা তুলে ধরা হলো:
মশা প্রজননস্থল ধ্বংস করা: বাড়ির আশপাশ, ছাদ, বারান্দা বা উঠানে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। ফুলের টব, টায়ার, ডাবের খোসা বা অব্যবহৃত পাত্রে যেন তিনদিনের বেশি পানি জমে না থাকে।
ব্যক্তিগত সুরক্ষা: দিনের বেলাতেও মশারি টাঙিয়ে ঘুমানো এবং বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ফুলহাতা জামা ও মশা নিরোধক ক্রিম (মস্কো রিপেলেন্ট) ব্যবহার করা উচিত।
লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা নয়: জ্বর আসার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং প্রয়োজনে রক্তের সম্পূর্ণ রক্ত গণনা (CBC) পরীক্ষা করাতে হবে। পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ: ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে প্রচুর পরিমাণে পানি, ওরস্যালাইন, ফলের রস ও তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে যাতে শরীর পানিশূন্য হয়ে না পড়ে।
ডেঙ্গু ভাইরাসের এই ধরণ পরিবর্তন আমাদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। শুধু চিকিৎসা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত মশার নিধন অভিযান এবং জনসচেতনতা। আসুন, প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হই, চারপাশ পরিষ্কার রাখি এবং নিজেদের ও পরিবারকে এই ভয়াবহ রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখি।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
শহর পেরিয়ে এখন গ্রামে গ্রামে কান্নার রোল: ডেঙ্গুর নীরব থাবায় নিভছে নিষ্পাপ শিশুদের জীবনপ্রদীপ
স্বজনদের ভারী নিঃশ্বাস আর অবুঝ শিশুর করুণ বিদায়: ডেঙ্গুতে ৩০০ ছুঁইছুঁই মৃত্যু, হামের থাবায় ঝরলো আরও ৮ তাজা প্রাণ
শিশুদের কান্না আর স্বজন হারানোর মিছিলে ভারী হচ্ছে বাতাস: মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে আমাদের চেনা ঢাকা শহর