সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

স্বাস্থ্য

স্বজনদের ভারী নিঃশ্বাস আর অবুঝ শিশুর করুণ বিদায়: ডেঙ্গুতে ৩০০ ছুঁইছুঁই মৃত্যু, হামের থাবায় ঝরলো আরও ৮ তাজা প্রাণ

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১:২১ পিএম
স্বজনদের ভারী নিঃশ্বাস আর অবুঝ শিশুর করুণ বিদায়: ডেঙ্গুতে ৩০০ ছুঁইছুঁই মৃত্যু, হামের থাবায় ঝরলো আরও ৮ তাজা প্রাণ

হাসপাতালের ঠান্ডা করিডোরগুলোতে এখন কেবলই স্বজনদের গুমরে কাঁদা কান্না আর হাহাকার। প্রিয়জনের জীবন বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করা মানুষের চোখেমুখে অনিশ্চয়তার কালো ছায়া। কোনো কোল খালি হচ্ছে ডেঙ্গুর নিষ্ঠুর ছোবলে, আবার কোথাও ফুটফুটে অবুঝ শিশুমুখ থমকে যাচ্ছে অজানা কষ্টের ছটফটানিতে। দেশে ডেঙ্গু ও হামের মতো সংক্রামক ব্যাধি এখন কেবল কোনো পরিসংখ্যানের অঙ্ক নয়; এটি হয়ে উঠেছে হাজারো পরিবারের কাছে এক করুণ ট্র্যাজেডি।

মৃত্যুর মিছিলে নিঃস্ব হাজারো পরিবার

মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াল রূপ যেন থামতেই চাইছে না। প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছে কোনো না কোনো মা-বাবার কোল আলো করা সন্তান, কিংবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। গত ২৪ ঘণ্টাতেই বিষাক্ত ডেঙ্গুর থাবায় ঢলে পড়েছে আরও চারটি তাজা প্রাণ।

বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই চারজন। তাদের চলে যাওয়া রেখে গেছে অসীম শূন্যতা। এ নিয়ে চলতি বছর কেবল ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন মোট ২৯৯ জন মানুষ। মৃত্যুর এই মিছিল এখন ৩০০-এর বিষাদময় মাইলফলকের দোরগোড়ায়।

হাসপাতালে শয্যা সংকট: ১,৬৩১ জন নতুন যোদ্ধার যন্ত্রণা

রোগীর চাপে হাসপাতালগুলোতে যেন নিঃশ্বাস নেওয়ারও জো নেই। গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নতুন করে আরও ১ হাজার ৬৩১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বেডে স্থান নিয়েছেন।

ঢাকার চিত্র: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীনে ৯২ জন এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ভর্তি হয়েছেন সর্বোচ্চ ৪০৬ জন। এর বাইরে ঢাকার অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি আছেন ২০৫ জন।

ঢাকার বাইরে চড়ছে পারদ: ঢাকার বাইরে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি চট্টগ্রামে, যেখানে একদিনেই ২৩৪ জন ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া বরিশালে ২১৯, খুলনায় ১৮৪, রাজশাহীতে ১৪১, রংপুরে ৭৫, ময়মনসিংহে ৬১ এবং সিলেটের হাসপাতাগুলোতে ১৪ জন ডেঙ্গু রোগী কাতরাচ্ছেন।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৭ হাজার ৮২ জন। যদিও চিকিৎসা শেষে ৯১ হাজার ৭ জন বাড়ি ফিরতে পেরেছেন, কিন্তু বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে লড়াই করছেন ৫ হাজার ৭৭ ৪ জন মানুষ।

শিশু ওয়ার্ডে শোকের ছায়া: হামের উপসর্গে ঝরলো ৮ নিষ্পাপ প্রাণ

ডেঙ্গুর আতঙ্কের মাঝেই দেশের শিশুদের ওপর নেমে এসেছে আরেক নির্মম নিয়তি। গত ২৪ ঘণ্টাতেই হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও আটটি নিষ্পাপ শিশুর। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই অবুঝ এই প্রাণগুলো বিদায় নিল পৃথিবী থেকে, যা তাদের মা-বাবাকে ঠেলে দিয়েছে এক আজীবন কান্নার সাগরে।

মারা যাওয়া এই আট শিশুর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২ জন, সিলেটের কোল খালি হওয়া ৩ জন, বরিশাল বিভাগে ২ জন এবং খুলনা বিভাগের ১ জন শিশু রয়েছে। যদিও একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যুর খবর আসেনি, তবে নতুন করে আরও ৮১ জনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে এ বছর নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্তের মোট সংখ্যা পৌঁছেছে ২০ হাজার ২৮২ জনে।

মাসের পর মাস বিষাদের ইতিহাস

বছরের শুরু থেকে মৃত্যুর এই সংখ্যাটি ছিল এক নীরব ঘাতকের মতো।

বছরের প্রথমভাগ: জানুয়ারিতে ২, ফেব্রুয়ারিতে ২, মে-তে ১ এবং জুনে ১৩ জনের প্রাণ কেড়ে নেয় ডেঙ্গু।

ভয়াল দ্বিতীয়ভাগ: জুলাই থেকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়; জুলাইয়ে ৩৬, আগস্টে ৪৩ এবং সেপ্টেম্বরে এক লাফে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়।

অক্টোবরের করুণ সূচনা: অক্টোবর মাসের প্রথম মাত্র ১০ দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন ৫৪ জন মানুষ।

মৃত্যুর এই গাণিতিক হিসাব হয়তো নথিপত্রে জমা থাকবে, কিন্তু যে পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে, তাদের জীবনের হিসাব মেলানো আর কখনোই সম্ভব হবে না। এ যেন এক নিরব মহামারীর সামনে এক অসহায় মানবতার দিনযাপন।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: