সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

স্বাস্থ্য

শিশুদের কান্না আর স্বজন হারানোর মিছিলে ভারী হচ্ছে বাতাস: মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে আমাদের চেনা ঢাকা শহর

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
শিশুদের কান্না আর স্বজন হারানোর মিছিলে ভারী হচ্ছে বাতাস: মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে আমাদের চেনা ঢাকা শহর

অক্টোবরের কুয়াশাচ্ছন্ন সকালগুলো এখন আর স্নিগ্ধতার বার্তা বয়ে আনে না; বরং প্রতিটি ভোরের আলো ফ্যাকাশে হয়ে আসে হাসপাতালের বারান্দায় কান্নার রোল আর স্বজনহারা মানুষের দীর্ঘশ্বাসে। ডেঙ্গু আজ কেবল একটি সাধারণ রোগ নয়, এটি আমাদের উদাসীনতা ও অবহেলার এক নিষ্ঠুর পরিণতি। কাগজ-কলমে কত নির্দেশিকা, কত পরিকল্পনা, অথচ বাস্তবে একটি জীবন বাঁচাতেও আমাদের আজ লড়াই করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

মৃত্যুর মিছিলে দীর্ঘ হচ্ছে শয্যা, ভারী হচ্ছে মায়ের কোল

অক্টোবরের এই ভয়ংকর দিনেও থামছে না মৃত্যুর মিছিল। একদিনেই ঝরে গেছে ৯টি অমূল্য প্রাণ—চলতি বছরে যা এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৯০২ জন মুমূর্ষু মানুষ। ঢাকার প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের বারান্দায়, মেঝেতে এখন কেবল তিল ধারণের ঠাঁই নেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন সরকারি হাসপাতালগুলো কোনো রোগীকে ফিরিয়ে দেবে না, নতুন করে তিনশ শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই শয্যাগুলো কি আমাদের অবহেলাকে ঢাকতে পারবে? হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা শিশুটির মলিন মুখ আর অসহায় মায়ের আকুল আর্তনাদ আজ আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

অবহেলায় ধূলিস্যাৎ নির্দেশিকা, মশার রাজত্বে জিম্মি জীবন

বছরের পর বছর ধরে বিশেষজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদরা বারবার সতর্ক করেছেন। ২০২১ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিল ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে জাতীয় নির্দেশিকা’। কিন্তু অত্যন্ত বেদনার বিষয় হলো, ইউনিয়ন থেকে শুরু করে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন—কোথাও মানা হচ্ছে না এই নির্দেশিকা। প্রতি মাসে মশার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা কেবল খাতায়-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। মশার লার্ভা ধ্বংস করার কথা সকালে আর উড়ন্ত মশা মারার কথা বিকেলে; কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষ দেখতে পায় না মশকনিধনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ। অনেক জায়গায় মশককর্মীদের বিরুদ্ধেও রয়েছে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ—টাকা না দিলে বাড়ির ভেতরে ওষুধ ছিটানো হয় না। আমাদের একটুখানি সচেতনতার অভাব আর দায়িত্বশীলদের চরম গাফিলতিতে আজ একটু একটু করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

শিশুরা আজ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে, নেই সময়ক্ষেপণের সুযোগ

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে যেসব শিশু হাসপাতালে আসছে, তাদের অনেকের অবস্থাই অত্যন্ত শোচনীয়। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন—শিশুদের প্রতি চাই বিশেষ নজর। সামান্য উপসর্গ দেখা দিলেই তাকে অবহেলা করা মানে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া। অন্যদিকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। চিকিৎসকরা বলছেন, শুধু প্লাটিলেট কমে যাওয়া নয়, শরীরের তরলের ভারসাম্য রক্ষা ও সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছানোই জীবন বাঁচাতে পারে। কিন্তু অনেক রোগীই হাসপাতালে আসেন যখন আর কিছুই করার থাকে না।

একটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার পর সব সতর্কতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। এখনই সময় দলমত নির্বিশেষে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে আমাদের প্রিয় এই শহরকে একটি নিরাপদ আবাসভূমিতে রূপ দেওয়ার। একটি জীবনও যেন আর ডেঙ্গুর কাছে হেরে না যায়—এটাই হোক আমাদের আজকের একমাত্র অঙ্গীকার। আপনার কি এই মানবিক প্রতিবেদনটিতে কোনো বিশেষ এলাকায় সংঘটিত ডেঙ্গু পরিস্থিতির অতিরিক্ত উপাত্ত বা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির আবেগঘন উদ্ধৃতি যোগ করার প্রয়োজন রয়েছে?

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: