রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

স্বাধীনতার মহাকাব্যে এক নীরব সারথি: বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব

লিখেছেন: অনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী প্রকাশিত: ৮ আগস্ট ২০২৬, ৭:৫৩ এএম
স্বাধীনতার মহাকাব্যে এক নীরব সারথি: বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব

একটি স্বাধীন দেশের জন্ম কখনোই আকস্মিক কোনো ইতিহাসের ঘটনা নয়; তার পেছনে থাকে যুগযুগান্তরের বঞ্চনা, অশ্রু, রক্ত, স্বপ্ন, সংগ্রাম আর অগণিত মানুষের নিঃশব্দ আত্মত্যাগ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসও তেমনই এক মহাকাব্য—যার প্রতিটি পঙ্‌ক্তি লেখা হয়েছে ত্যাগে, প্রতিরোধে এবং রক্তে। সেই মহাকাব্যের দৃশ্যমান মহানায়ক ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; আর দৃশ্যপটের আড়ালে থেকে যাঁর প্রজ্ঞা, সাহস, মমতা ও আত্মত্যাগ সেই সংগ্রামকে দিয়েছে দৃঢ় ভিত, তিনি বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

আর সেই ত্যাগের আলোকেই বেড়ে উঠেছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শেখ কামাল—স্বাধীন বাংলাদেশের নবীন স্বপ্ন, তারুণ্যের দীপ্ত প্রতীক। একজন ছিলেন জাতির মুক্তির সংগ্রামের নেপথ্য সারথি, অন্যজন স্বাধীনতার পর নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্নে উজ্জ্বল এক তরুণ অগ্রদূত।

টুঙ্গিপাড়ার রেণু থেকে বাঙালির বঙ্গমাতা: ত্যাগের অগ্নিপথ

মধুমতীর স্নিগ্ধ বাতাস, সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি আর মাটির গন্ধে ঘেরা টুঙ্গিপাড়া শুধু বঙ্গবন্ধুর জন্মভূমি নয়; এই মাটিই জন্ম দিয়েছিল বাঙালির ইতিহাসের এক অনন্য মহীয়সী নারীকে। ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট জন্ম নেওয়া সেই ছোট্ট মেয়েটির ডাকনাম ছিল ‘রেণু’। অতি অল্প বয়সেই বাবা-মাকে হারিয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। পারিবারিক সিদ্ধান্তে শৈশবেই তাঁর বিবাহ হয় শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে।

সময় গড়াল। সেই ছোট্ট রেণুই ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন বঙ্গবন্ধুর জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সহযাত্রী—নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের এক অদৃশ্য শক্তি।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে রেণু তাঁর স্বামীর রাজনৈতিক জীবনকে এগিয়ে নিতে নিজের সামান্য সঞ্চয় পর্যন্ত বিলিয়ে দিয়েছেন। কলকাতায় পড়াশোনা কিংবা রাজনীতির ব্যস্ত জীবনে অর্থকষ্টে পড়লে তিনি পাশে দাঁড়িয়েছেন নির্ভরতার শেষ আশ্রয় হয়ে।

১৯৪৬ সালের কলকাতার ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ও তাঁর অসীম ধৈর্য ও দায়িত্ববোধের পরিচয় মেলে। স্বামী যখন মানুষের পাশে দাঁড়াতে ছুটে বেড়াচ্ছেন, তখন নিজের অসুস্থতা কিংবা নিঃসঙ্গতার কথা না ভেবে তিনি তাঁকে দায়িত্ব পালনে উৎসাহ দিয়েছেন।

রেণু বুঝেছিলেন—শেখ মুজিব কেবল তাঁর স্বামী নন; তিনি একটি নিপীড়িত জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তাই ব্যক্তিগত সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার বিনিময়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন বৃহত্তর এক স্বপ্নের সহযাত্রা।

এইভাবেই টুঙ্গিপাড়ার সাধারণ ‘রেণু’ একদিন পরিণত হলেন কোটি বাঙালির হৃদয়ের ‘বঙ্গমাতায়’।

ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর: একটি ঘর, একটি দুর্গ, একটি ইতিহাস

পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির আন্দোলন যত তীব্র হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনও তত দীর্ঘ হয়েছে। একের পর এক গ্রেপ্তার, কারাবাস, মামলা আর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মধ্যেও আন্দোলনের আগুন নিভতে দেননি তাঁর সহযোদ্ধারা। আর এই দীর্ঘ সংগ্রামের নেপথ্যে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল এক অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল।

সেই বাড়ির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বঙ্গমাতা।

বাইরে পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের নজরদারি, ভেতরে সংসারের অনিশ্চয়তা—এর মাঝেও তিনি ছিলেন অবিচল। কারাগারে বন্দি বঙ্গবন্ধুর কাছে রাজনৈতিক খবর পৌঁছানো, তাঁর নির্দেশনা দলের নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া, আন্দোলনরত কর্মীদের পাশে দাঁড়ানো—সবকিছুই তিনি সামলেছেন অসাধারণ বিচক্ষণতায়।

অর্থের সংকট দেখা দিলে নিজের গয়না, প্রয়োজনীয় সামগ্রী—এমনকি সংসারের জিনিসপত্রও বিক্রি করতে দ্বিধা করেননি। কিন্তু সন্তানদের সামনে কখনো দুর্বল হয়ে পড়েননি। বরং তাঁদের বুঝিয়েছেন—তাঁদের বাবা ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থে নয়, দেশের মানুষের জন্য সংগ্রাম করছেন।

এই কারণেই ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর কেবল একটি বাড়ি ছিল না। সেটি হয়ে উঠেছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের এক নীরব দুর্গ; আর বঙ্গমাতা ছিলেন সেই দুর্গের অদৃশ্য প্রহরী।

প্রজ্ঞার দীপ্তি: আগরতলা মামলা থেকে ৭ই মার্চের মহাকাব্য

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যখন একটি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেছে ইতিহাসের গতিপথ। বঙ্গমাতার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বলতম স্বাক্ষর পাওয়া যায় তেমনই দুটি সন্ধিক্ষণে।

প্যারোল নয়—চেয়েছিলেন নিঃশর্ত মুক্তি

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে কারাবন্দি করার পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতার পথে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। অনেকেই সেই প্রস্তাব গ্রহণের পক্ষে ছিলেন।

কিন্তু বঙ্গমাতা ছিলেন অনড়।

তাঁর অবস্থান ছিল পরিষ্কার—বঙ্গবন্ধুর মুক্তি হতে হবে নিঃশর্ত। প্যারোলের শর্ত মেনে কোনো সমঝোতা নয়। এই দৃঢ় অবস্থান শুধু একজন স্ত্রীর আবেগ ছিল না; এর মধ্যে ছিল গভীর রাজনৈতিক উপলব্ধি। পরবর্তীকালে গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল স্রোতে আইয়ুব খানের পতন ঘটে, বঙ্গবন্ধু মুক্তি লাভ করেন এবং বাঙালি তাঁকে অভিষিক্ত করে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে।

৭ই মার্চ: ইতিহাসের ভাষণের আগে এক নারীর নীরব পরামর্শ

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে চারদিকে নেতাকর্মীদের ভিড়। কী বলা হবে, কীভাবে বলা হবে—নানা পরামর্শে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ। কিন্তু ভাষণের আগে বঙ্গবন্ধুকে একান্তে ডেকে নেন বঙ্গমাতা। তিনি জানতেন, ওই মুহূর্তে কোনো লিখিত ভাষণ ইতিহাস তৈরি করতে পারবে না। ইতিহাস তৈরি করবে মানুষের হৃদয়ের ভাষা।

তাঁর সেই পরামর্শের মর্মার্থ ছিল—চারপাশের পরামর্শের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের বিবেক ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার কথা বলতে হবে। তারপর বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠলেন।

৭ই মার্চের সেই বজ্রকণ্ঠ উচ্চারণে কেঁপে উঠল রেসকোর্স ময়দান, আর তার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র বাংলায়। একটি জাতি পেল স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রস্তুতির আহ্বান। সেই ভাষণের দৃশ্যমান কণ্ঠ ছিল বঙ্গবন্ধুর; কিন্তু তার অন্তরালে যে গভীর আত্মিক শক্তি ও মানসিক দৃঢ়তা কাজ করেছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিলেন বঙ্গমাতা।

শেখ কামাল: মায়ের ত্যাগের পাঠশালা থেকে স্বাধীনতার স্বপ্নে বঙ্গমাতার সন্তানদের জীবনেও তাঁর আদর্শের গভীর ছাপ ছিল। তাঁদের মধ্যে শেখ কামাল ছিলেন এক অনন্য প্রতিভাবান তরুণ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অস্ত্র হাতে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন। স্বাধীনতার পরও তাঁর স্বপ্ন থেমে থাকেনি। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু একটি স্বাধীন পতাকা পেলেই একটি জাতির পূর্ণ মুক্তি আসে না; প্রয়োজন সংস্কৃতি, ক্রীড়া, শিক্ষা, সৃজনশীলতা ও আধুনিক চিন্তার বিকাশ।

তাই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও শেখ কামাল নতুন রাষ্ট্রের তারুণ্যকে সংগঠিত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে তিনি চেয়েছিলেন একটি আধুনিক, আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তুলতে।

এই স্বপ্নের শিকড়ও ছিল তাঁর মায়ের জীবনদর্শনে—দেশকে ভালোবাসা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর কল্যাণকে বেছে নেওয়া।

১৫ আগস্ট: রক্তাক্ত প্রভাতে শেষ অধ্যায়

তারপর এল ইতিহাসের সেই কালরাত্রি—১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট।

ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে ঘাতকের বুলেট একে একে নিভিয়ে দিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালও সেই নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হলেন। স্বাধীনতার জন্য যে তরুণ একদিন অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতেই তাঁকে প্রাণ দিতে হলো। আর বঙ্গমাতা?

জীবনের যে মানুষটির পাশে দাঁড়িয়ে তিনি দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিটি ঝড় অতিক্রম করেছিলেন, শেষ মুহূর্তেও তাঁর কাছ থেকে সরে যাননি। ঘাতকের সামনে দাঁড়িয়েও তিনি দেখিয়েছিলেন আত্মমর্যাদা, ভালোবাসা ও সাহসের অনন্য দৃষ্টান্ত।

১৫ আগস্ট তাই শুধু একটি পরিবারের শোকের দিন নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়। সেদিন একটি পরিবারকে হত্যা করা হয়েছিল, কিন্তু সেই পরিবারের ত্যাগ, স্বপ্ন ও আদর্শকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায়নি।

শেষকথা: ইতিহাসের আলোয় অমলিন এক নক্ষত্র বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন না কোনো প্রচারসর্বস্ব রাজনীতিক। তিনি ছিলেন না ক্ষমতার মঞ্চের দৃশ্যমান কোনো চরিত্র। তাঁর শক্তি ছিল নেপথ্যে, তাঁর নেতৃত্ব ছিল নীরব, তাঁর ত্যাগ ছিল নিঃশব্দ। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কাজগুলো অনেক সময় নীরব হাতেই সম্পন্ন হয়। বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে তিনি একটি পরিবারকে আগলে রেখেছেন; আর সেই পরিবারের মধ্য দিয়েই একটি জাতির মুক্তির স্বপ্নকে লালন করেছেন। কারাগারের অন্ধকারে বন্দি স্বামীর পাশে থেকেছেন, সন্তানদের মানুষ করেছেন, রাজনৈতিক ঝুঁকি সামলেছেন, সংকটে দলের কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দিয়েছেন দৃঢ় সিদ্ধান্তের সাহস।

তাই বঙ্গমাতা শুধু বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী নন; তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অনিবার্য অধ্যায়। রক্তে লেখা যে স্বাধীনতার মহাকাব্য, তার প্রতিটি পৃষ্ঠার দৃশ্যমান অক্ষরের আড়ালে যে অদৃশ্য কালি—তার নাম ত্যাগ। আর সেই ত্যাগের অমলিন প্রতীক— বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। তিনি ইতিহাসের প্রান্তে নন; তিনি ইতিহাসের অন্তর্গত আলো। তিনি কোনো ক্ষণিকের স্মৃতি নন; তিনি বাঙালির স্বাধীনতার মহাকাব্যে চিরজাগরূক এক নক্ষত্র।

লেখক: অনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র সিলেট সিটি কর্পোরেশন