মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

দেউলিয়া বিদ্যুৎ খাত, অন্ধকার জীবন: তারেক-ইউনূস-ফাওজুলের চক্রান্তে জনজীবনের চরম দুর্যোগ

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:০৭ পিএম
দেউলিয়া বিদ্যুৎ খাত, অন্ধকার জীবন: তারেক-ইউনূস-ফাওজুলের চক্রান্তে জনজীবনের চরম দুর্যোগ

আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের দুঃশাসনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত রূপ নিয়েছিল সীমাহীন লুটপাট আর অর্থপাচারের চারণভূমিতে। তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা অনিয়ম ঢেকে রাখতে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার এক কৃত্রিম নাটক সাজিয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দেশবাসী যে পরিবর্তনের আশা করেছিল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পদক্ষেপে তা এক গভীর হতাশায় রূপ নেয়।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয় সাবেক আমলা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানকে। আওয়ামী আমলের বিতর্কিত নীতি ও নসরুল হামিদের বলয় থেকে মুক্ত হওয়ার বদলে, বিদ্যুৎ খাতের নীতি আগের মতোই রয়ে যায়। বিদ্যুৎ বিভাগকে পরিকল্পিতভাবে দেউলিয়া করে এক ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যা মূলত এক গভীর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রেরই ফসল।

হুংকার ও বাস্তবতার ফারাক: দায়মুক্তির আড়ালে পুরনো চুক্তি বহাল

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে ঘোষণা দিয়েছিল—অলস বসে থাকা এবং ক্যাপাসিটি চার্জের নামে জনগণের টাকা লুটে নেওয়া অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর লাইসেন্স বাতিল করা হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।

• দায়মুক্তি আইনের মারপ্যাঁচ: ২০১০ সালের বিতর্কিত 'বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন' বা দায়মুক্তি আইন বাতিলের যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়, তা কার্যত এক প্রতারণামূলক দলিলে পরিণত হয়। অধ্যাদেশে বলা হয়, আগে সম্পাদিত সব চুক্তি বা কার্যক্রম এমনভাবে অব্যাহত থাকবে যেন আইনটি বাতিলই হয়নি।

• লুটপাটের বলয় অব্যাহত: হুংকার সত্ত্বেও বেশিরভাগ অচল ও লাভজনক নয় এমন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর পেছনে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন ও কায়েমী স্বার্থরক্ষার অভিযোগ প্রবল হয়ে ওঠে।

বাঁকিতে চলা খাত ও দেউলিয়াত্বের শেষ পেরেক

দেড় বছরের শাসনামলে ইউনূস সরকার বিদ্যুৎ খাতের পাওনা মেটাতে চরম উদাসীনতা দেখায়। একমাত্র আদানিকে কিছু অর্থ পরিশোধ ছাড়া কয়লা আমদানি, গ্যাস আমদানি এবং ক্যাপাসিটি চার্জের বকেয়া পরিশোধ না করে সবকিছু চালানো হয় বাকিতে।

ইউনূস সরকারের বকেয়া ঋণের রূপরেখা:

├── মোট বকেয়া ঋণ: প্রায় ৪৫,০০০ কোটি টাকা ├── বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওনা: ১৪,০০০ কোটি টাকা └── বিল বকেয়ার সময়কাল: ২০২৫ সালের জুলাই থেকে টানা ৮ মাস

কোনো পরিশোধ না করে বিপুল বকেয়া ঋণের বোঝা রেখে যাওয়ায় বর্তমানে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় কোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানই বাকিতে জ্বালানি দিতে রাজি হচ্ছে না। ফলে কয়লা ও গ্যাসের তীব্র অভাবে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কুঠারাঘাত ও দ্বৈত নীতি

গ্রিডে যখন সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের ঘাটতি চরম, ঠিক তখনই ইউনূস সরকার বেশ কিছু চরম আত্মঘাতী পদক্ষেপ নেয়।

• ৩৭টি নবায়নযোগ্য প্রকল্প বাতিল: ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে অনুমোদন পাওয়া প্রায় ৩,২৮৭ মেগাওয়াট সক্ষমতার ৩৭টি সরকারি, বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প এক লহমায় বাতিল করা হয়। • বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা: বাতিলকৃত প্রকল্পের বিপরীতে নতুন করে ৫৫টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের দরপত্র আহ্বান করা হলেও মাত্র ১১টি কেন্দ্র (৯০০ মেগাওয়াট) দরপত্র জমা দেয়। 'সভরেন গ্যারান্টি' না থাকায় আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেন।

• রামপালে উল্টো হাঁটা: পরিবেশ বিধ্বংসী ও সুন্দরবনের জন্য মারাত্মক হুমকি জেনেও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল না করে বহাল রাখা হয়, যা সরকারের চরম নীতিহীনতা ও দ্বৈত নীতির প্রমাণ দেয়।

এলএনজি আমদানিতে অস্বচ্ছতা ও অনিয়ম

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কারের নামে ড. ইউনূসের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছিল আরও নতুন অনিয়ম। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠক চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানাভিত্তিক 'আর্জেন্ট এলএনজি'র সঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির একটি অস্পষ্ট নন-বাইন্ডিং চুক্তি করে বিডা।

কোনো দরপত্র ছাড়া, পেট্রোবাংলাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এই চুক্তি সম্পাদন করা হয়। ঘন ঘন বিকল হওয়া এলএনজি টার্মিনালের কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মক ধসের মুখে পড়ে।

আইসিইউতে বিদ্যুৎ খাত: ক্ষোভের অনলে সাধারণ মানুষ

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিদ্যুৎ খাতে বকেয়ার পাহাড় দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকায়। দীর্ঘ আট মাস ধরে বেসরকারি খাতকে কোনো বিল দেওয়া হয়নি। পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা এই অচলাবস্থার কারণে আজ সারাদেশ লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে নিমজ্জিত। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ভাষায়, “বিদ্যুৎ খাত আগেই নাজুক অবস্থায় ছিল, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত পদক্ষেপ কার্যত এটিকে আইসিইউতে পাঠিয়ে দিয়েছে।” সরকারের চরম ব্যর্থতা, খামখেয়ালিপনা এবং প্রশাসনিক ষড়যন্ত্রের কারণে সাধারণ মানুষকে চরম গরমে, অন্ধকারে দিন কাটাতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতের এই দেউলিয়াত্ব ও জনদুর্ভোগের জাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আজ দাবানলের মতো জ্বলছে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

সম্পর্কিত সংবাদ

ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের জয়জয়কার, মোদির আমন্ত্রণ প্রত্যাখানের পর এবার সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টায় বাংলাদেশ

ডি-ডলারাইজেশন নয়, প্রযুক্তিগত সংস্কার: BRICS-এ ভারতের বাস্তবমুখী কৌশল। বৈশ্বিক লেনদেনে এক নতুন দিগন্ত: লেনদেন সহজ করতেই ভারতের ঐতিহাসিক সিবিডিসি (CBDC) উদ্যোগ

পিঠে দেওয়াল, অস্তিত্বের চরম সংকট: আর কত রক্ত দিলে জাগবে বিবেক? রাষ্ট্রযন্ত্রের নীরবতা নাকি প্রশ্রয়? বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিধনের ভয়াবহ বাস্তবচিত্র