পিঠে দেওয়াল, অস্তিত্বের চরম সংকট: আর কত রক্ত দিলে জাগবে বিবেক? রাষ্ট্রযন্ত্রের নীরবতা নাকি প্রশ্রয়? বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিধনের ভয়াবহ বাস্তবচিত্র
রক্তে ভেজা মাটি, ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন মন্দির আর ভিটেমাটি হারানো হাজারো আর্তনাদ—আজ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিত্যদিনের অন্ধকার বাস্তবতা। পরিবর্তন এসেছে ক্ষমতায়, বদলেছে মুখের সারির রাজনীতি, কিন্তু বদলায়নি আক্রান্ত মানুষের কপাল। মার খেতে খেতে আজ পিঠ ঠেকে গেছে দেওয়ালে। অস্তিত্ব রক্ষার এই চরম সংকটে দাঁড়িয়ে আজ চারদিকে একটাই গর্জন—বাঁচতে গেলে লড়তে হবে, বাঁচতে গেলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে!
ইউনুস থেকে তারেক জমানা: বহাল তবিয়তে ‘মেটিকুল্যাস ডিজাইন’
এক সময়ের বিতর্কিত নোবেলজয়ী প্রধানের আমল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন কিংবা তারেক রহমানের বার্তা—কোনোটাই থামাতে পারেনি সনাতনীদের ওপর চলা নির্মমতা। নিন্দুকেরা বলেন, তথাকথিত ‘মেটিকুল্যাস ডিজাইন’-এর জালে আটকে ফেলে যে নীরব রক্তপাতের নীল নকশা তৈরি করা হয়েছিল, তা যেন এখনও নিখুঁতভাবে সক্রিয়। সরকার বদলালেও প্রশাসনের উপরতলার প্রচ্ছন্ন মদত আর নিষ্ক্রিয়তা কেন? প্রতিটা হত্যা, জমি দখল আর মন্দির ভাঙচুরের পর ঘটনাগুলোকে সাজানো হচ্ছে ‘পারিবারিক কারণ’ বা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে। দায়িত্ব এড়ানোর এই নয়া কৌশল কি আসলে অপরাধীদের আড়াল করার এক গভীর ছকবাজি?
রক্তাক্ত অতীত ও ভয়াল স্মৃতি: ভালুকা থেকে ২০২৬-এর নৃশংসতা
ময়মনসিংহের ভালুকায় ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল তরুণ দীপু দাসকে। সেই ভয়াবহ দৃশ্যে যখন উন্মত্ত জনতার তালি আর শিস দেওয়ার শব্দে শিউরে উঠেছিল বিশ্ব, ভ্যাটিকান থেকে উঠেছিল কড়া প্রতিবাদ, ভেবেছিলেন হয়তো বদলাবে দিন? না, বদলায়নি। ২০১৫ থেকে ২০২৬—হত্যার মিছিলে যোগ হয়েছে একের পর এক নাম।
চঞ্চল চন্দ্র ভৌমিক, সমীর দাস, প্রলয় চাকী, জয় মহাপাত্র, মিঠুন সরকার, শরৎমণি চক্রবর্তী, রানা প্রতাপ বৈরাগী, খোকন চন্দ্র দাস কিংবা অমৃত মণ্ডল—তালিকাটা এতই দীর্ঘ যে নাম লিখতে গিয়ে হাত কেঁপে ওঠে। নৃশংস কায়দায় গলা কেটে খুন, গ্যারেজে অগ্নিসংযোগ, কিংবা গুম—অপরাধীদের উল্লাস থামেনি। বিচারের নামে চলছে শুধুই প্রহসন। অধিকাংশ ঘটনায় থানায় মামলা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে না।
ডারউইনের তত্ত্ব আর অস্তিত্বের চরম ডাক
যখন রাষ্ট্রযন্ত্র হাত গুটিয়ে বসে থাকে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে, তখন চার্লস ডারউইনের সেই বিখ্যাত ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ বা নিউটনের ‘প্রতিক্রিয়া তত্ত্ব’ স্বাভাবিকভাবেই জনমনে জেগে ওঠে। অস্তিত্ব বাঁচাতে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে রাজপথে গর্জে উঠছে সোচ্চার কণ্ঠ। চার দফা দাবিতে এখন রাজপথে নামার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কারণ একটাই—আর নীরবতা নয়, নীরব থাকা মানেই এই নৃশংস অপরাধকে সমর্থন করা!
প্রতিরোধের দাবানল: বাঁচতে হলে ঐক্যই একমাত্র পথ
দেশ-বিদেশের ছাত্র, শিক্ষক, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ—সবাইকে আজ এক ছাতার তলায় আসার সময় এসেছে। যারা নিজেদের নির্যাতন দেখেও স্বার্থের টানে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকে, তাদের সামাজিক বর্জনের ডাক উঠছে। আজ আর জাতের নামে বজ্জাতি করার সময় নেই; আক্রান্ত মানুষগুলো এখন এক নৌকার যাত্রী।
সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, সংখ্যালঘু কমিশন গঠন এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের দাবিতে এখন বিশ্বব্যাপী সোচ্চার হওয়ার সময়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিশ্বের সকল সনাতনী সংগঠনগুলোর জোরালো হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
শেষ সমীকরণ: উত্তর খুঁজছে দেশ
অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে দিতে যেখানে প্রশাসন নিজেই দায়বদ্ধতার খাতায় নাম লিখিয়েছে, সেখানে স্রেফ লোকদেখানো প্রতিশ্রুতি দিয়ে কি মোছা যাবে এই মৌলবাদের ক্ষত? রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা কি দিতে পারবেন সেই সুরক্ষার গ্যারান্টি? উত্তর মেলে না। তবে রক্তাক্ত পথই আজ মানুষকে শিক্ষা দিয়েছে—অনুনয়-বিনয়ে মুক্তি মিলবে না, কেবল মাত্র ইস্পাত কঠিন ঐক্য আর রাজপথের লড়াকু প্রতিরোধই পারবে এই প্রলয়ঙ্করী কালো মেঘ কাটিয়ে ভোরের আলো ফিরিয়ে আনতে।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের জয়জয়কার, মোদির আমন্ত্রণ প্রত্যাখানের পর এবার সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টায় বাংলাদেশ
ডি-ডলারাইজেশন নয়, প্রযুক্তিগত সংস্কার: BRICS-এ ভারতের বাস্তবমুখী কৌশল। বৈশ্বিক লেনদেনে এক নতুন দিগন্ত: লেনদেন সহজ করতেই ভারতের ঐতিহাসিক সিবিডিসি (CBDC) উদ্যোগ
দেউলিয়া বিদ্যুৎ খাত, অন্ধকার জীবন: তারেক-ইউনূস-ফাওজুলের চক্রান্তে জনজীবনের চরম দুর্যোগ