মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

আন্তর্জাতিক

ইউক্রেন যুদ্ধ বিরতি ও ট্রাম্পের নতুন কূটনৈতিক চাল: শান্তির সম্ভাবনা নাকি অর্থ আদায়ের নতুন কৌশল?

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫১ পিএম
ইউক্রেন যুদ্ধ বিরতি ও ট্রাম্পের নতুন কূটনৈতিক চাল: শান্তির সম্ভাবনা নাকি অর্থ আদায়ের নতুন কৌশল?

দীর্ঘ সাড়ে চার বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও ধ্বংসযজ্ঞের পর অবশেষে কি থামতে যাচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ? ওয়াশিংটনের নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা ও মস্কোর তিন দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে নতুন এক আশার আলো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনারের মস্কো সফরকে ঘিরে ইউরোপের রাজনীতির দৃশ্যপটে তৈরি হয়েছে এক নতুন মোড়। তবে যুদ্ধের অস্ত্র শান্ত করার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি এই যুদ্ধ খরচের বিশাল বোঝা ইউরোপের কাঁধে চাপানোর ট্রাম্পীয় বার্তা পুরো প্রক্রিয়াটিকে এক জটিল অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

মস্কোয় ট্রাম্পের প্রতিনিধি: ক্ষণিক শান্তির বার্তা

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ক্রেমলিনের বিশেষ বার্তা নিয়ে মস্কো বিমানবন্দরে পৌঁছান মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। বিমানবন্দরে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান রুশ প্রেসিডেন্টের বিশেষ প্রতিনিধি কিরিল দিমিত্রিয়েভ। মার্কিন প্রতিনিধিদের এই আগমনের পর পরই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষ থেকে আসে এক বড় ঘোষণা। পুতিন জানিয়েছেন, ট্রাম্পের দূতদের এই সফর ও আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখতে আগামী তিন দিন ইউক্রেনে কোনো প্রকার হামলা চালাবে না রুশ বাহিনী।

এর আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও ঘোষণা করেছিলেন যে, মার্কিন দূতদের সফর ও লজিস্টিক সুবিধার স্বার্থে কিয়েভ কোনো আকাশপথে হামলা চালাবে না এবং রাশিয়াকেও একই পথ অনুসরণের আহ্বান জানান। যদিও আনুষ্ঠানিক এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ঠিক আগের দিনও ইউক্রেনের কিয়েভস্থ নিরাপত্তা বাহিনীর সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন শহরের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় রাশিয়া। পাল্টা জবাব হিসেবে রাশিয়ার ভূখণ্ডের ভেতরে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছিল ইউক্রেনও।

ট্রাম্পের ‘গোপন’ প্রস্তাব ও ক্রেমলিনের কঠিন শর্ত

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে তাঁর প্রশাসনের কাছে একটি নতুন ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রয়েছে। যদিও এই প্রস্তাবের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ্যে আনা হয়নি। রোববার মার্কিন এই প্রতিনিধি দল কিয়েভ সফর করবেন এবং প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে বসবেন।

তবে স্থায়ী শান্তির পথ এখনো অত্যন্ত দুর্গম। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানানো হয়েছে, প্রেসিডেন্ট পুতিন তাঁর আগের শর্তেই অটল রয়েছেন। রাশিয়ার মূল দাবি—ইউক্রেনকে তাদের চার অঞ্চল (যা রাশিয়া নিজেদের বলে দাবি করে) থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং ন্যাটোর (NATO) সদস্যপদ পাওয়ার আশা চিরতরে ত্যাগ করতে হবে। অন্যদিকে ইউক্রেনও নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অনড়। ফলে দুপক্ষের দূরত্ব কতটা কমবে, তা নিয়ে সংশয় কাটেনি।

ইউরোপের কাঁধে বিলিয়ন ডলারের বোঝা: ট্রাম্পের কঠোর বার্তা

যুদ্ধের ময়দানে যখন কূটনৈতিক আলোচনার তোড়জোড় চলছে, ঠিক তখনই ওয়াশিংটন থেকে ট্রাম্পের এক বিস্ফোরক বার্তা বিশ্ব রাজনীতিকে তোলপাড় করে দিয়েছে। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইউক্রেনকে দেওয়া বিগত সামরিক সহায়তা ও অস্ত্রশস্ত্রের সমস্ত অর্থ এবার ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছ থেকে আদায় করা হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প তাঁর পূর্বসূরি বাইডেন প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, "ইউক্রেন ও ন্যাটোকে কোনো চার্জ ছাড়াই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছে, যা ইউরোপেরই পরিশোধ করার কথা ছিল। এবার আমরা সেই অর্থ ফেরত চাইব।" একই সঙ্গে আমেরিকার নিজস্ব অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার খবর উড়িয়ে দিয়ে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য মিত্র দেশগুলোর কাছে সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র বিক্রি আপাতত স্থগিত রাখা হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও জ্বালানি বাজার: জোড়া সংকটের মুখে বিশ্ব অর্থনীতি

বিশ্ব অর্থনীতি এখন একই সঙ্গে দুটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে সংঘাত। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ইউক্রেন কর্তৃক রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ও তেল শোধনাগারে সাম্প্রতিক হামলা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে। ইউক্রেন যুদ্ধের এই অর্থনৈতিক প্রভাব এবং জ্বালানি সংকটের মাশুল গুণতে হচ্ছে পুরো বিশ্বকে, যা আসন্ন মার্কিন নির্বাচনেও বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শান্তির পথ কতদূর?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মাটিতে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই যুদ্ধ কীভাবে বন্ধ হবে—তা নির্ভর করছে আগামী কয়েকদিনের মার্কিন মধ্যস্থতা ও আলোচনার ফলাফলের ওপর। তিন দিনের এই সাময়িক হামলা বিরতি কি একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির দিকে নিয়ে যাবে, নাকি ট্রাম্পের অর্থনৈতিক চাপ ও পুতিনের কঠিন শর্তের মুখে পড়ে আলোচনা ফের ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে—এখন সে দিকেই তাকিয়ে বিশ্ববাসী।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)