শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

মৃত্যুর পরও মুক্তি নেই একাত্তরের বীরের: এ কেমন বাংলাদেশ যেখানে মুক্তিযোদ্ধার কবর খোঁড়ার জন্য বিচারে মুখোমুখি হতে হয়।

✍ লিখেছেন: জাহাঙ্গীর কবির নানাক,রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী, প্রেসিডিয়াম সদস্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
মৃত্যুর পরও মুক্তি নেই একাত্তরের বীরের: এ কেমন বাংলাদেশ যেখানে মুক্তিযোদ্ধার কবর খোঁড়ার  জন্য  বিচারে  মুখোমুখি হতে হয়।

একবার বুক হাত দিয়ে ভাবুন—এই স্বাধীন মাতৃভূমি আজ কাদের কবজায় চলে গেছে! একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যিনি একাত্তরের রণাঙ্গনে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করেছিলেন, আজ মৃত্যুর পর এই স্বাধীন মাটিতেই তাঁর নিজের একটি কবরের জায়গার জন্য যুদ্ধ করতে হলো! এ কোন ঘোর অন্ধকারের যুগে বাস করছি আমরা?

যে মানুষটি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, যিনি ন্যায়বিচারের স্বার্থে রাজাকারদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের মূল সাক্ষী হয়েছিলেন—সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ নিয়ে যে নোংরা তামাশা হলো, তা আমাদের জাতীয় চেতনার কপালে এক কলঙ্কের তিলক এঁকে দিয়েছে।

২৪ অক্টোবর ২০২৬। ৮৭ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। পিরোজপুরের চিতলিয়া গ্রামের যে মাটিতে তাঁর জন্ম, যে মাটিকে তিনি ভালোবেসেছিলেন—আজ মৃত্যুর পর সেই মাটির কোল থেকেই তাঁকে বঞ্চিত করার অপচেষ্টা চালানো হলো। রাষ্ট্রপক্ষের ৬ নম্বর সাক্ষী হয়ে যিনি একাত্তরের ঘৃণিত অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন, মৃত্যুর পরেও তাঁকে পোহাতে হলো দানবীয় আক্রোশ।

রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার তো দূরের কথা, নিজ এলাকায় তাঁর দাফনের জন্য যে কবরটি খোঁড়া হয়েছিল, তা পর্যন্ত ভরাট করে দেওয়া হলো! একজন মৃত মুক্তিযোদ্ধার দাফন নিয়ে এমন অমানুষিক বাধা, এমন বর্বরোচিত আচরণ—কী প্রমাণ করে? এটি কেবল একজন ব্যক্তির অবমূল্যায়ন নয়, এটি সরাসরি আমাদের স্বাধীনতার ওপর, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর এক নিকৃষ্ট আঘাত।

আজ প্রশ্ন জাগে—এই বাংলায় কি তবে রাজাকারের দোসররাই শেষ কথা বলবে? যে মাটিতে রক্ত দিয়ে আমরা পতাকা এনেছি, সেই মাটিতে কি একজন মুক্তিযোদ্ধার লাশও আজ নিরাপদ নয়? এ কেমন ভণ্ডামি, যেখানে প্রকাশ্যে বাধা দিয়ে আবার দায় এড়ানোর চতুর নাটক খেলা হয়?

রাষ্ট্রের কাছে আমাদের তীব্র ও জোরালো প্রশ্ন: একজন গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহের সম্মান রক্ষা করা, তাঁর পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়া এবং দাফন নিশ্চিত করার দায়িত্ব কি প্রশাসনের ছিল না? এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িত প্রতিটি কুচক্রীকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

মানিক পশারী আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তিনি আমাদের সামনে এক জ্বলন্ত প্রশ্ন রেখে গেছেন—যে মানুষটি আমাদের জন্য একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়ে গেছেন, সেই দেশের মাটিতে তাঁর শেষ আশ্রয়টুকু নিশ্চিত করার দায়িত্ব কি আজ আমরা চিরতরে হারিয়ে ফেললাম?

সালাম তোমায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। আপনার অবদানের ঋণ শোধ করার সাধ্য এই বাংলার নেই, কিন্তু আপনার অসম্মান আমরা কোনোভাবেই হতে দেব না।

লেখক: জাহাঙ্গীর কবির নানাক,রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী, প্রেসিডিয়াম সদস্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: