শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ, সামরিক বিমানে ভারতে যাত্রা এবং গোপনীয়তার প্রশ্ন; ভিডিও ধারণের জেরে চাকরিচ্যুতি, কোর্ট মার্শাল ও এক কর্মকর্তার রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ৬:২৮ পিএম
৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ, সামরিক বিমানে ভারতে যাত্রা এবং গোপনীয়তার প্রশ্ন; ভিডিও ধারণের জেরে চাকরিচ্যুতি, কোর্ট মার্শাল ও এক কর্মকর্তার রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিব সাউরির মরদেহ তুরাগ নদে ভেসে ওঠার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনাপ্রবাহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও, সেটি ধারণ ও প্রকাশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্মকর্তাদের পরবর্তী পরিণতি এবং বিমানবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের তদন্ত—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে ওই দিনের ঘটনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মতো রাষ্ট্রীয় ও সামরিকভাবে স্পর্শকাতর একটি ঘটনা কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল? সেনাপ্রধান, নৌবাহিনী প্রধান ও বিমানবাহিনী প্রধান কি পুরো বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন? যদি তাঁরা জানতেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি কেন? আর যদি কোনো পর্যায়ে সামরিক বাহিনীর ভেতরে পৃথক ব্যবস্থাপনা কাজ করে থাকে, তাহলে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন?

তাহসিব সাউরির মৃত্যুর পর এসব প্রশ্ন আর কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি, শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন হিসেবেও সামনে এসেছে।

তাহসিব সাউরির মৃত্যুতে নতুন করে আলোচনায় ৫ আগস্ট বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিব সাউরির মরদেহ তুরাগ নদে ভেসে ওঠার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে নানা আলোচনা শুরু হয়। এরই মধ্যে সামনে আসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময় ধারণ করা একটি ভিডিওর ঘটনা। বিভিন্ন বক্তব্য ও সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, কুর্মিটোলা অফিসার্স মেস থেকে বিমানবাহিনীর আরেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত ওই সময়ের দৃশ্য ধারণ করেছিলেন। পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন তাহসিব সাউরি। ভিডিওটিতে শেখ হাসিনাকে সামরিক হেলিকপ্টার থেকে নেমে সামরিক জিপে করে বিমানবন্দরের রানওয়ের দিকে যেতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে।

এই ভিডিও প্রকাশের পর তাহসিব সাউরির বিরুদ্ধে বিমানবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত শুরু করে বলে তাঁর নিজের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এয়ার ইন্টেলিজেন্সের পক্ষ থেকে তাঁকে জানানো হয়েছিল, স্বেচ্ছায় অবসরে গেলে গ্রেপ্তার বা হয়রানির মুখে পড়তে হবে না। সেই পরিস্থিতিতে তিনি অবসরের কাগজে স্বাক্ষর করেন।

তাঁর দাবি, অবসরের পরও তাঁকে বিভিন্নভাবে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। এমনকি তাঁর পাসপোর্ট দীর্ঘ সময় আটকে রাখা এবং বিমানবাহিনীতে অর্জিত ফ্লাইং আওয়ার ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছিল।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রকাশিত না হওয়ায় পুরো বিষয়টির সত্যতা ও প্রেক্ষাপট এখনো স্পষ্ট নয়।

৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ: সামরিক নেতৃত্ব কী জানত?

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি চোখে পড়ে। সেদিন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার আগে থেকেই বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে শেখ হাসিনার গণভবন ত্যাগ এবং দেশত্যাগের খবর প্রচারিত হচ্ছিল। পরে সেনাপ্রধানের সঙ্গে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানদেরও জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং সেনাবাহিনী দেশের আইনশৃঙ্খলা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে—এমন বক্তব্য দেওয়া হয়। কিন্তু শেখ হাসিনাকে কীভাবে গণভবন থেকে সরিয়ে সামরিক ব্যবস্থাপনায় ভারতে পৌঁছে দেওয়া হলো, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

প্রশ্ন হচ্ছে, যখন দেশের তিন বাহিনীর ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে একজন বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীকে নিরাপদে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সেই প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলো না কেন?

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের বিষয়টি যদি সামরিক বাহিনীর পরিকল্পিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হয়ে থাকে, তাহলে এর নেতৃত্বে কারা ছিলেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি কী ছিল, তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

ভারতীয় বক্তব্যেও উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

শেখ হাসিনার দেশত্যাগ নিয়ে ভারতের বক্তব্যও এ ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট দেশটির সংসদে দেওয়া বক্তব্যে জানান, বাংলাদেশের পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে শেখ হাসিনা ভারতে আসার সিদ্ধান্ত নেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর বিমানের অবতরণের অনুমতি চাওয়া হয়।

একইভাবে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের সূত্রেও সামনে এসেছে, শেখ হাসিনার বিমান ভারতে অবতরণের অনুমতি চাওয়ার বিষয়টি ছিল অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া একটি প্রক্রিয়া।

এখানে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। কে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অবতরণের অনুমতি চেয়েছিলেন? কোন সামরিক বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সেই যোগাযোগ করা হয়েছিল? বিমানটি যখন ভারতে অবতরণ করে, তখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন—সে ক্ষেত্রে তাঁর নিরাপত্তা ও যাত্রার দায়িত্ব কার ওপর ছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।

ওয়াকার-উজ-জামানের ভূমিকা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বর্ণনা

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময় সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান সেনা সদরে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন বলে বিভিন্ন বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের একটি সাক্ষাৎকারে দাবি করা হয়, টেলিভিশনে শেখ হাসিনার গণভবন ত্যাগের খবর প্রচারিত হওয়ার পর সেনাপ্রধান বিস্মিত হয়েছিলেন এবং পরে শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।

এই বর্ণনা সত্য হলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—সেনাপ্রধান যদি তখনো ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তথ্য না জেনে থাকেন, তাহলে শেখ হাসিনাকে সামরিক ব্যবস্থাপনায় ভারতে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কে বা কারা নিয়েছিলেন?

অন্যদিকে, আরেকটি তত্ত্বে বলা হয়, ওয়াকার-উজ-জামান চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা গণভবনেই অবস্থান করুন। এমনকি সামরিক বাহিনীর ভেতরের কোনো কোনো অংশ তাঁকে সেখানে রেখে দেওয়ার পক্ষে ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আরও গুরুতর একটি অভিযোগ হলো, গণভবনে অবস্থান করলে শেখ হাসিনা বড় ধরনের হামলা কিংবা হত্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারতেন। তবে এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি। ফলে বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তবু প্রশ্নটি উপেক্ষা করা যায় না—৫ আগস্টের সংকটময় সময়ে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে কি একাধিক সিদ্ধান্তকেন্দ্র সক্রিয় ছিল?

ভিডিও প্রকাশের পর সামরিক কর্মকর্তাদের পরিণতি

তাহসিব সাউরির বক্তব্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের ভিডিও প্রকাশের পর বিমানবাহিনীর অভ্যন্তরে একটি তদন্ত পরিচালিত হয়। তদন্তের সূত্র ধরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তাঁর দাবি, গ্রুপ ক্যাপ্টেন সেলিম জাবেদ তাঁকে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁকে স্বেচ্ছায় অবসরে যেতে বলা হয়। একই ঘটনার সূত্র ধরে বিমানবাহিনীর আরও কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।

এমনকি ওই সময়ের তদন্তে একজন কর্মকর্তার কোর্ট মার্শাল এবং ১০ বছরের কারাদণ্ডের কথাও আলোচনায় এসেছে। তবে এই শাস্তির সুনির্দিষ্ট কারণ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পরিচয় এবং আদালতের রায়ের বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়—একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ঘটনার ভিডিও ধারণ বা প্রচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কারণ কী ছিল? তাঁরা কি কেবল সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন, নাকি ভিডিওটির মাধ্যমে এমন কোনো স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল, যা সামরিক বাহিনীর কোনো অংশের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল?

নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্বে কারা ছিলেন?

শেখ হাসিনাকে গণভবন থেকে সরিয়ে নেওয়া, সামরিক হেলিকপ্টারে করে বিমানঘাঁটিতে পৌঁছানো এবং পরে সামরিক বিমানে ভারতে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল।

এ ধরনের অভিযানে সাধারণত নিরাপত্তা, পরিবহন, বিমান পরিচালনা এবং কমান্ড কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন হয়। ফলে কয়েকজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে এত বড় একটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল—এমন ধারণা স্বাভাবিকভাবেই আরও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রধানেরা কি পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত ছিলেন? সংশ্লিষ্ট পাইলট ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা কার নির্দেশে দায়িত্ব পালন করেছিলেন? শেখ হাসিনার সঙ্গে শেখ রেহানাসহ অন্য কেউ বিমানে ছিলেন কি না এবং থাকলে তাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কারা পালন করেছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে সামরিক কমান্ড কাঠামোর ভূমিকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।

ভিডিওটি কি কেবল একটি আকস্মিক ধারণ করা দৃশ্য?

ভিডিওটি নিয়েও রয়েছে বেশ কিছু প্রশ্ন। কুর্মিটোলা অফিসার্স মেসের জানালা থেকে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত দৃশ্যটি ধারণ করেছিলেন বলে যে বক্তব্য সামনে এসেছে, তা সত্য হলে আরও কিছু বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

সেদিন অফিসার্স মেসে কতজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন? তাঁরা কি দায়িত্ব পালন করছিলেন, নাকি ঘটনাটি আকস্মিকভাবে তাঁদের চোখে পড়ে? এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনার ভিডিও কি কেবল একজনই ধারণ করেছিলেন? অন্য কোনো কর্মকর্তা বা নিরাপত্তা ক্যামেরায় কি একই দৃশ্য ধারণ হয়েছিল?

এ ছাড়া ভিডিওটি কোন দূরত্ব থেকে এবং কী ধরনের যন্ত্রে ধারণ করা হয়েছিল, সেটিও যাচাই করা যেতে পারে।

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ভিডিওটির পেছনের সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট বোঝা কঠিন। তবে ভিডিও ধারণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরবর্তী পরিণতি এবং তাঁদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকলে সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

তাহসিবের মৃত্যু: প্রশ্নের উত্তর দেবে কে?

তাহসিব সাউরির মৃত্যুর পর তাঁর বোন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে অভিযোগ করেছেন, তাঁর ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ সামনে আসায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।

তাহসিবের বক্তব্য অনুযায়ী, অবসরে যাওয়ার পরও তাঁকে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা অনুসরণ করতেন। তিনি ৫ আগস্টের ঘটনার বিষয়ে অনেক কিছু জানেন, কিন্তু সবকিছু প্রকাশ করতে পারছেন না—এমন কথাও সাক্ষাৎকারে বলেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন, তাঁর কাছে এমন কী তথ্য ছিল, যা প্রকাশ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি? কেন তাঁকে অবসরে পাঠানোর পরও নজরদারিতে রাখার অভিযোগ উঠেছে? তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ৫ আগস্টের ভিডিও বা পরবর্তী সামরিক তদন্তের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা তদন্তে বেরিয়ে আসা জরুরি।

তবে কেবল পূর্ববর্তী চাকরিগত বিরোধ কিংবা ভিডিও প্রকাশের ঘটনাকে ভিত্তি করে তাঁর মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। মৃত্যুর কারণ, ময়নাতদন্ত, সম্ভাব্য অপরাধের আলামত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই প্রকৃত সত্য নির্ধারিত হওয়া উচিত। স্বচ্ছতা ছাড়া সন্দেহ দূর হবে না

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নাটকীয় দিন। সেদিনের ঘটনাপ্রবাহে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি রক্তপাতহীন রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেই ভূমিকার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যাও জরুরি।

বিশেষ করে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগ, সামরিক হেলিকপ্টার ও বিমানের ব্যবহার, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্মকর্তাদের পরবর্তী পরিণতি—এসব বিষয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা উচিত।

একজন কর্মকর্তা ভিডিও ধারণের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে চাকরি হারিয়েছেন কি না, অন্য কর্মকর্তার কোর্ট মার্শাল কেন হয়েছে এবং সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিব সাউরির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর অভ্যন্তরে যদি ৫ আগস্টের ঘটনা নিয়ে কোনো ধরনের মতপার্থক্য, তদন্ত বা প্রশাসনিক জটিলতা থেকে থাকে, তবে তা গোপন রাখলে সন্দেহ আরও বাড়বে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাহসিব সাউরির মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং ৫ আগস্টের সামরিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরা।

কারণ একটি রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা শুধু তার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে তার স্বচ্ছতা, পেশাদারত্ব এবং জবাবদিহির ওপরও।

৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটিত না হলে তাহসিব সাউরির মৃত্যু ঘিরে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোরও সহজে অবসান হবে না।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: