মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন গুঞ্জন: ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক মনস্তত্ত্ব, বিদেশি উদ্বেগ ও রাজনীতির নতুন মেরুকরণ

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫০ পিএম
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন গুঞ্জন: ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক মনস্তত্ত্ব, বিদেশি উদ্বেগ ও রাজনীতির নতুন মেরুকরণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে হঠাৎ করেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও গুঞ্জনের ঝড় উঠেছে। দেশের মূলধারার গণমাধ্যম থেকে শুরু করে শীর্ষ রাজনৈতিক মহলে এটি এখন প্রধান আলোচনার বিষয়। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিপরীতমুখী বক্তব্য, দিল্লির কূটনৈতিক বার্তা এবং ঢাকায় বিদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ—সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ইস্যুটি কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এক জটিল ও ধোঁয়াশাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বিপরীতমুখী বক্তব্য ও সরকারের নীতিগত দ্বিধা

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং তাকে কেন্দ্র করে আইনি ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে শুরু থেকেই বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে।

গ্রেফতার বনাম প্রত্যর্পণ: সরকারের একাংশের দাবি, শেখ হাসিনা দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় তাকে ভারতে ধরে নিয়ে আসার বা প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। অন্য একটি সূত্র বলছে, তিনি নিজে থেকে দেশে ফিরলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করা হবে।

জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের বক্তব্য পরিবর্তন: সরকারের শীর্ষ উপদেষ্টা পর্যায়ের ব্যক্তিত্বদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে নীতিগত দ্বিমুখিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন—শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে সরকার স্বাগত জানাবে কি না, নাকি তাকে জোরপূর্বক ফেরত আনা হবে—তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সামনে ভিন্ন ভিন্ন সুর লক্ষ্য করা গেছে। এই ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যকে বিশ্লেষকরা সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তহীনতার লক্ষণ হিসেবেই দেখছেন।

দিল্লির বার্তা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক টিমের পরিকল্পনা

ভারতের বিভিন্ন মাধ্যম ও কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে পর্দার অন্তরালে যোগাযোগ চলছে। তবে ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দৈনিক আনন্দবাজার-এর প্রতিবেদন দাবি করেছে, ভারত আপাতত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর বা প্রত্যর্পণ করবে না।

এদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিউ দিল্লি পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে এক চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে:

পর্যবেক্ষক দল: সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সাবেক কূটনীতিবিদদের নিয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক টিম থাকতে পারে।

পিটার ফারেনহোল্টসের উদ্যোগ: ২০১৮ থেকে ২০২১ মেয়াদে বাংলাদেশে জার্মানির সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টস নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সাথে এক বৈঠকে এই প্রস্তাব দিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে পিটার ফারেনহোল্টস স্পষ্ট করেছেন যে, এতে জার্মান সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই; এটি তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগ।

ইউরোপীয় রাজনীতিবিদদের সম্পৃক্ততা: ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রভাবশালী সদস্য আন্দ্রে দোস্তালের মতো ব্যক্তিত্বদের সাথেও কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক স্তরে যোগাযোগ জোরদার করা হচ্ছে।

মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও ডিসেম্বরের রোডম্যাপ

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, শেখ হাসিনা চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশের মাটিতে পা রাখার প্রাথমিক পরিকল্পনা করছেন।

সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের পরিকল্পনা: খবরে দাবি করা হচ্ছে, ভারতের পেট্রাপোল দিয়ে বাংলাদেশের বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে দেশে প্রবেশের পথটি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

‘সাংগঠনিক পাইলট কর্মসূচি’: শেখ হাসিনার ফেরা উপলক্ষে তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রস্তুতি শুরু করেছে দলটির নেতাকর্মীরা। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সক্রিয় নেতাদের দায়িত্ব বণ্টন করে একটি বিশেষ সাংগঠনিক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে।

কূটনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভরতা: তবে তার ফেরা ও চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণার পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার কূটনৈতিক শর্তসাপেক্ষ সমঝোতার ওপর। সমঝোতা না হলেও আকস্মিকভাবে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি ফিরতে পারেন বলে কোনো কোনো সূত্র দাবি করছে।

ঢাকার কূটনীতিকদের উদ্বেগ ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণার পর থেকেই ঢাকার কূটনৈতিক পাড়ায় এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। বিশেষ করে প্রায় ৩৫টি দেশের কূটনীতিকরা বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষ মহলে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে তাদের গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা: কূটনীতিকদের আশঙ্কা, শেখ হাসিনার ফেরাকে কেন্দ্র করে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হতে পারে এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।

বিদেশি বিনিয়োগে ধস:

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নীতিগত দন্দ্বে দেশে বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (FDI) আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য উল্লেখ করে জানা গেছে, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিনিয়োগ বিপুল পরিমাণে হ্রাস পেয়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, যা ১৯৮১ সালের পর দেশের সর্বনিম্ন বিনিয়োগ পারফরম্যান্স।

সমঝোতার সমীকরণ নাকি নতুন সংঘাত?

বর্তমানের বহুমুখী আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে বাংলাদেশ সরকারের সামনে এখন বড় ধরনের নীতিগত চ্যালেঞ্জ উপস্থিত। ভারতের প্রত্যর্পণ অস্বীকৃতির পর সরকারের সামনে প্রধানত দুটি পথ খোলা রয়েছে— ১. শেখ হাসিনাকে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী দেশে ফিরতে দিয়ে গ্রেফতার ও আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা। ২. তাঁর প্রত্যাবর্তনে কঠোর বাধা তৈরি করা এবং রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখা।

তবে সরকারি ও রাজনৈতিক একাধিক মহল মনে করছে, সংঘাত এড়াতে আওয়ামী লীগের ওপর থাকা বিভিন্ন বিধিনিষেধ ও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে একটি মধ্যস্থতামূলক সমঝোতার চেষ্টা হতে পারে। সরকার যদি দ্রুত কোনো স্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্তে না পৌঁছায়, তবে এই রাজনৈতিক ধোঁয়াশা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর জন্য আরও বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)