বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

চারটি প্রাণ, অসংখ্য প্রশ্ন: রংপুরের হত্যাকাণ্ড কি শুধু একটি অপরাধ ? শোকের আড়ালে যে প্রশ্নগুলো চাপা পড়ছে ।

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম
চারটি প্রাণ, অসংখ্য প্রশ্ন: রংপুরের হত্যাকাণ্ড কি শুধু একটি অপরাধ ? শোকের আড়ালে যে প্রশ্নগুলো চাপা পড়ছে ।

রংপুরের গণপতি বাবুর পরিবারের হত্যাকাণ্ড শুধু চারটি প্রাণহানির ঘটনা নয়—এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তাবোধ এবং ভবিষ্যৎকে একসঙ্গে হত্যা করার মতো নির্মম ঘটনা। একটি পরিবারের নারী সদস্যদের হত্যার আগে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, শিশুটিকে হত্যার আগে তার শরীরে নৃশংস নির্যাতনের অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে এসব তথ্য গোপন রাখার প্রশ্ন—সব মিলিয়ে ঘটনাটি ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ ও অসংখ্য প্রশ্ন।

ময়নাতদন্ত নিয়ে এত প্রশ্ন কেন?

ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, আলামত, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য—এসবই একটি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অথচ এই ঘটনায় ময়নাতদন্ত ও মরদেহের ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা কি পাওয়া গেছে?

বিশেষ করে, স্বাভাবিক তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই মরদেহ দ্রুত দাহ করার সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো—এই প্রশ্নের স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর জনগণ জানতে চায়। যদি কোনো অপরাধের আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেটি শুধু তদন্তের জন্য নয়, ন্যায়বিচারের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পুলিশের বক্তব্যে অসঙ্গতি থাকলে জবাব চাই

এই হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্যে যদি পরস্পরবিরোধিতা থেকে থাকে, তাহলে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। পুলিশ কী বলেছে, তদন্তকারীরা কী পেয়েছেন, ময়নাতদন্তে কী এসেছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা কী বলেছেন—সবকিছু জনসমক্ষে স্বচ্ছতার সঙ্গে তুলে ধরা জরুরি।

কারণ রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা গড়ে ওঠে সত্য গোপন করে নয়, সত্য উদঘাটনের মাধ্যমে।

সংখ্যালঘু নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। কোনো একটি হত্যাকাণ্ডকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সংঘটিত কোনো অপরাধকে ‘সাধারণ ক্রাইম’ বলে দ্রুত পাশ কাটিয়ে যাওয়াও সমানভাবে বিপজ্জনক।

একটি পরিবার যদি তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আতঙ্কে থাকে, তবে সেই আতঙ্ক দূর করার দায় রাষ্ট্রের। অপরাধী হিন্দু, মুসলমান কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ের—আইনের চোখে তার পরিচয় একটাই: অপরাধী।

সরকারের কাছে একটাই দাবি—সত্য প্রকাশ করুন

রংপুরের এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নয়, চাই নিরপেক্ষ তদন্ত। চাই ফরেনসিক প্রমাণ প্রকাশ। চাই ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন। চাই মরদেহ দ্রুত দাহের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা। চাই পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতিটি বক্তব্যের জবাবদিহি।

কারণ চারটি মানুষকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু সত্য উদঘাটন করা সম্ভব। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব।

রাষ্ট্র যদি সত্যিই প্রমাণ করতে চায় যে বাংলাদেশে প্রত্যেক নাগরিক সমান নিরাপদ, তাহলে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত হতে হবে এমন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ, যাতে কোনো সম্প্রদায়ের মনে আর একটি প্রশ্নও না থাকে—‘আমরা কি এই দেশে সত্যিই সমান নাগরিক?’

শোককে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত না করে, বরং সত্যকে সামনে এনে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করাই হোক এই চারটি প্রাণের প্রতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)