রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে উগ্র সশস্ত্র তৎপরতা ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন: বাংলাদেশ সরকারের নীতিগত অবস্থানের একটি বিশ্লেষণাত্নক মূল্যায়ন

লিখেছেন: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৯ এএম
দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে উগ্র সশস্ত্র তৎপরতা ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন: বাংলাদেশ সরকারের নীতিগত অবস্থানের একটি বিশ্লেষণাত্নক মূল্যায়ন

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত স্পর্শকাতর মোড় নিয়েছে। টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমারের শক্তিশালী অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (AA)-এর দৃশ্যমান উপস্থিতি এবং বান্দরবান সীমান্তে কেএনএফ (কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট)-এর ধারাবাহিক তৎপরতা সীমান্ত নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। একই সাথে মিয়ানমার জান্তা সরকারের পক্ষ থেকে প্রেরিত একের পর এক কূটনৈতিক বার্তা (নোট ভারবাল) এবং ঢাকার পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ নীরবতা আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সীমান্তের ত্রিমুখী সংঘাতের সমীকরণ টেকনাফ সীমান্তে আরাকান আর্মির সশস্ত্র মহড়া মূলত রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন ‘আরসা’ (ARSA)-কে কেন্দ্র করে। আরাকান আর্মি নাফ নদী ও তৎসংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় আরসার ঘাঁটি এবং প্রভাব নির্মূল করতে চায়। এর বিপরীতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর অস্থিতিশীলতা এবং স্থানীয় নিরাপত্তার ওপর তৈরি হয়েছে তীব্র ঝুঁকি। যদি সীমান্তে আরাকান আর্মি, আরসা এবং বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সংঘাত ঘটে, তবে তা ত্রি-মুখী সামরিক মুখোমুখি অবস্থানে রূপ নিতে পারে। অন্যদিকে, পার্বত্য বান্দরবানে কুকি-চিন আর্মির (কেএনএফ) উপস্থিতি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার পাশাপাশি সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকেও জটিল করে তুলেছে। এই অঞ্চলে একই সাথে অরাষ্ট্রীয় একাধিক সন্ত্রাসী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা সমগ্র দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক নিরাপত্তাকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মিয়ানমারের কূটনৈতিক বার্তা ও ঢাকার অবস্থান সম্প্রতি মিয়ানমার সরকার 'নোট ভারবাল'-এর মাধ্যমে ঢাকাকে কয়েকটি গুরুতর বিষয়ে অবহিত করেছে। প্রথমত, সীমান্তে পরিস্থিতির অবনতি হলে এবং ঢাকা সময়মতো তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে এর দায় বাংলাদেশের ওপর বর্তাবে বলে সতর্ক করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় বেশ কিছু পশ্চিমা দেশের কর্মকর্তাদের কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা তৎপরতা এবং ঘন ঘন বৈঠকের বিষয়ে মিয়ানমার তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। সবচেয়ে স্পর্শকাতর অভিযোগটি হলো—সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার কার্যক্রম বা ক্যাম্পের উপস্থিতি। মিয়ানমারের দাবি অনুযায়ী, আগামী ১৭ই আগস্টের মধ্যে এসব অবকাঠামো বা তৎপরতা গুটিয়ে না নিলে তারা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এই পুরো প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নীতি-নির্ধারকদের নীরবতা বা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার অভাব নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলছে। এমনকি জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন পর্যায়—যেমন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ডক্টর খলিলুর রহমানও এসব বিষয়ে কোনো বিস্তারিত মন্তব্য বা তথ্য জানা নেই বলে এড়িয়ে গেছেন, যা কূটনৈতিক রহস্য আরও ঘনীভূত করেছে। কূটনৈতিক নীরবতার সম্ভাব্য কারণ ও পরিণতি

১. কৌশলগত সংযম (Strategic Restraint): মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধে জান্তা বাহিনী কিংবা বিরোধী আরাকান আর্মি—কোনো পক্ষকেই উসকানি না দিয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা। ২. তথ্য যাচাইকরণ: মিয়ানমার জান্তা সরকারের দেয়া স্পর্শকাতর অভিযোগগুলোর (যেমন পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা বা পশ্চিমা হস্তক্ষেপ) সত্যতা ও উদ্দেশ্য নিশ্চিত না হয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্যে না যাওয়া। ৩. বহুপাক্ষিক ভারসাম্য: চীন, ভারত, পশ্চিমা বিশ্ব এবং মিয়ানমারের জান্তা ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলা। তবে কৌশলগত নীরবতা দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও সীমান্ত নিরাপত্তার নীতি দুর্বল হিসেবে প্রতিপন্ন হতে পারে। মিয়ানমারের আলটিমেটাম এবং সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ যদি সীমান্ত অতিক্রম করে, তবে তা সরাসরি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করতে হলে সীমান্ত এলাকায় অবিলম্বে কঠোর দৃশ্যমান নজরদারি বাড়াতে হবে। আরসা বা কুকি-চিনের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবসান ঘটাতে অভ্যন্তরীণ অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কূটনৈতিক টেবিলে মিয়ানমার সরকারের নোট ভারবালের পরিষ্কার ও বস্তুনিষ্ঠ জবাব দেয়া প্রয়োজন। কারণ, নীরবতা যেমন কৌশল হতে পারে, তেমনি সঠিক সময়ে তা না ভাঙলে তা সংকটের গভীরতা বাড়িয়ে দিতে পারে।

লেখক: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন, সাংবাদিক,রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক,দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা