মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা, কৌশলগত পরিবর্তন ও পুনর্গঠনের পথনকশা ১৯৭২-এর সংবিধান, সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, আইনি ও ডিজিটাল লড়াই এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া।

লিখেছেন: ঈশ্বর ভট্টাচার্য, কবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশিত: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৩ এএম
সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা, কৌশলগত পরিবর্তন ও পুনর্গঠনের পথনকশা  ১৯৭২-এর সংবিধান, সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, আইনি ও ডিজিটাল লড়াই এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া।

পর্ব ২:

১. ১৯৭২ সালের সংবিধান: আধুনিক রাষ্ট্র ও বিশ্বসভ্যতার পথনির্দেশ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্তিত্ব এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দর্শনের মূল তাত্ত্বিক ও আইনি দস্তাবেজ হলো ১৯৭২ সালের সংবিধান। এটি কেবল একটি আইনি বই নয়; এটি ছিল হাজার বছরের বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার এবং রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত দর্শনের রাষ্ট্রীয় দলিল। ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা—কেবল তৎকালীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমঝোতা ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্বসভ্যতার আধুনিক অগ্রযাত্রার সাথে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার প্রধান সেতু।

ফরাসি বিপ্লবের 'স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্ব' এবং বিশ শতকের প্রগতিশীল সামাজিক সাম্যের ভাবধারা থেকে রসদ নিয়ে এই সংবিধান একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রযন্ত্রের রূপরেখা তৈরি করেছিল। ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে সেখানে ধর্মহীনতা নয়, বরং রাষ্ট্রকাঠামো থেকে ধর্মীয় ভেদাভেদ দূর করে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা বোঝানো হয়েছিল। জাতীয়তাবাদ নিশ্চিত করেছিল বাঙালি সংস্কৃতির অখণ্ডতা, সমাজতন্ত্র নির্দেশ করেছিল অর্থনৈতিক শোষণমুক্তি, আর গণতন্ত্র নিশ্চিত করেছিল জনগণের সার্বভৌমত্ব।

এই মূলনীতিগুলো থেকে বিচ্যুতি রাষ্ট্র এবং আওয়ামী লীগ উভয়কেই তার মূল অক্ষ থেকে বিচ্যুত করে ফেলে। যখন রাষ্ট্র বা দল রাজনৈতিক সুবিধার খাতিরে এই চার মূলনীতি থেকে সরে আসে, তখন সে প্রকারান্তরে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে। ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিকে শিথিল করে প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শের সাথে আপস করা মূলত আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের পথ বন্ধ করে কুসংস্কার ও সংকীর্ণতার অন্ধকার যুগে ফিরে যাওয়ার শামিল।

২. আইনি দমন বনাম প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক রূপান্তর

ঐতিহাসিক অপরাধ বা রাষ্ট্রবিরোধী অপশক্তির বিচারের জন্য বিচার বিভাগীয় কঠোর পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি, তবে তা কখনই সুদূরপ্রসারী আদর্শিক লড়াইয়ের বিকল্প হতে পারে না। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে আইনিভাবে নিষিদ্ধ করা কিংবা কয়েকজন অপরাধীকে শাস্তির মুখোমুখি করাকে যদি মূল সাফল্য মনে করা হয়, তবে তা এক ধরণের মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল হিসেবে দেখা দেয়।

জার্মান দার্শনিক হান্নাহ আরেন্ডট তাঁর বিভিন্ন গবেষণায় দেখিয়েছিলেন যে, বাহ্যিক প্রশাসনিক কঠোরতা বা আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে মৌলবাদ ও একনায়কত্বের বাহ্যিক রূপ দমন করা গেলেও, তার অন্তর্নিহিত মনস্তাত্ত্বিক শিকড় উপড়ে ফেলা যায় না। কেবল শাস্তিমূলক পদক্ষেপের ওপর ভরসা করে যদি সমাজে প্রগতিশীল চিন্তার বিকাশ ঘটানো না হয়, তবে সেই মৌলবাদী অপশক্তি নতুন নামে, নতুন ছদ্মবেশে পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসে।

অতএব, ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা মেটাতে হলে কেবল প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কার সাধন করতে হবে। ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বা সহিংস আচরণের পথ পরিহার করে আইনের শাসনের স্বচ্ছ প্রয়োগ ঘটাতে হবে এবং একই সাথে সমাজতাত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক লড়াইয়ের মাধ্যমে মৌলবাদের বয়ানকে জনমনে অযৌক্তিক ও বাতিল হিসেবে প্রমাণ করতে হবে।

৩. ডিজিটাল প্রাঙ্গণ ও আধুনিক তথ্যযুদ্ধের রূপরেখা

একবিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক ও আদর্শিক লড়াই কেবল আর রাজপথের স্লোগান বা জনসভার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি স্থানান্তরিত হয়েছে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ডিজিটাল প্রাঙ্গণে। অনলাইন বিভিন্ন মঞ্চে প্রতিদিন যে তথ্যযুদ্ধ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে, তা মানুষের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে নির্ধারণ করে দিচ্ছে। আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের মতে, বর্তমান যুগের যুদ্ধগুলো মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের রূপ ধারণ করেছে, যার প্রধান লক্ষ্য মানুষের মোবাইল পর্দার মানসিক জগত। প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে প্রযুক্তি স্পেসে গুজব, বিভ্রান্তিকর ভিডিও, খণ্ডিত ইতিহাস এবং উগ্র ধর্মীয় আবেগ ছড়ানোর জন্য বিশাল জাল বিস্তার করেছে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থকরা যুক্তিনির্ভর বয়ান তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেবল ব্যক্তিগত তোষামোদ বা সস্তা স্লোগান প্রচারের মাধ্যম বানিয়ে ফেলেছে। ফলে যুক্তির ময়দানে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে মৌলবাদী প্রোপাগান্ডা সহজে স্থান করে নিচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রগতিশীলতার পক্ষে আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ও ইতিহাসসম্মত তথ্য উপস্থাপন করতে না পারলে এই তথ্যযুদ্ধে জয়ী হওয়া অসম্ভব।

৪. তরুণ প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও ইতিহাসবিচ্ছিন্নতা

যেকোনো সমাজ পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হলো তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু ইতিহাস ও তাত্ত্বিক শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার কারণে বর্তমান তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রান্তির মধ্যে বাস করছে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, অসাম্প্রদায়িকতার প্রয়োজনীয়তা এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশির মতামত অনুসরণ করে বলা যায়, একটি আদর্শ তখনই টিকে থাকে যখন তা তরুণদের দৈনন্দিন সংস্কৃতি ও শিক্ষার অংশে পরিণত হয়। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় প্রগতিশীল ভাবধারার অবমূল্যায়ন, ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর বিকৃতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরের সংকীর্ণ সংস্কৃতির কারণে তরুণরা ইতিহাস চেতনা হারিয়ে ফেলেছে। তরুণরা যখন দেখে প্রগতিশীল রাজনীতির নামে সুবিধাবাদী রূপ ফুটে উঠছে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প হিসেবে মৌলবাদী কিংবা ছদ্মবেশী বয়ানের দিকে আকৃষ্ট হয়। এই বিভ্রান্তি থেকে তরুণদের বের করে আনতে হলে অন্ধ আনুগত্যের চর্চা বন্ধ করতে হবে। তাদের শেখাতে হবে কীভাবে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মুক্তমনে বিশ্লেষণ করতে হয়।

৫. সর্বজনীন সাংস্কৃতিক আন্দোলন: অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিপ্রস্তর

আইন করে কিংবা রাজনৈতিক আদেশ দিয়ে একটি সমাজকে ধর্মনিরপেক্ষ বা অসাম্প্রদায়িক বানানো যায় না। অসাম্প্রদায়িকতা হলো একটি সাংস্কৃতিক অনুভূতির বিষয়, যা গড়ে ওঠে সমাজের দৈনন্দিন চর্চা, সাহিত্য, শিল্পকলা এবং যৌথ উদযাপনের মধ্য দিয়ে। একটি দেশে যত বেশি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থাকবে, সেখানে মৌলবাদ ও ধর্মীয় উগ্রতার সুযোগ তত কমবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি রাজনৈতিক অর্জনের পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক জাগরণ। ছায়ানট, উদীচী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট কিংবা পাড়া-মহল্লার নাট্যদলগুলো যে মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছিল, তার ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাজপথে রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করতে পেরেছিল।

একটি প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া মূলত চারটি মূল কাঠামোগত ধাপে অগ্রসর হয়:

1. সাংস্কৃতিক জাগরণ: পাড়া-মহল্লায় নাটক, সংগীত ও লোকউৎসবের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া। 2. বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা: বৈজ্ঞানিক শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজের কুপমণ্ডুকতা দূর করা এবং যুক্তিবাদী মন তৈরি করা। 3. প্রগতিশীল গণমাধ্যম: যুক্তি ও ইতিহাসভিত্তিক সঠিক তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। 4. নাগরিক সাম্য ও আইনি অধিকার: ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা। 5. কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতির ডামাডোলে আওয়ামী লীগ তার এই সর্বজনীন সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে অবহেলা করেছে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে দলীয় আনুগত্যের ফ্রেমে বন্দি করায় সাধারণ মানুষের সাথে সংস্কৃতি চর্চার দূরত্ব তৈরি হয়েছে। মৌলবাদের প্রতিরোধ করতে হলে গ্রামে-গঞ্জে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং পাড়া-মহল্লায় বই পড়া, নাটক, সংগীত ও লোকউৎসবের উন্মুক্ত চর্চা পুনরায় চালু করার কোনো বিকল্প নেই।

৬. চারিত্রিক ও আচরণগত বিশ্লেষণ: অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরণ

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা অনুপ্রবেশকারী ও ছদ্মবেশীদের চেনার জন্য প্রশাসনিক গোয়েন্দা তথ্যের চেয়ে তাদের দৈনন্দিন চারিত্রিক ও আচরণগত বিশ্লেষণ অনেক বেশি কার্যকর। কোনো ব্যক্তি মুখে কী বলছেন তার চেয়ে তিনি দৈনন্দিন জীবনে কী আচরণ করছেন—তা দিয়েই তার আদর্শিক অবস্থান বোঝা সম্ভব। সমাজতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রগতিশীল দলের ভেতরের অনুপ্রবেশকারীদের চারটি সুনির্দিষ্ট আচরণের মাধ্যমে চিহ্নিত করা সম্ভব:

• আদর্শিক অসংগতি: তারা দলীয় মঞ্চে উপস্থিত থেকে প্রগতিশীল স্লোগান দিলেও ব্যক্তিগত জীবনে, পরিবারে কিংবা সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে উগ্র ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করেন। • অর্থনৈতিক সুবিধাবাদ: দলের যেকোনো দুঃসময়ে বা আদর্শিক সংগ্রামে এদের খুঁজে পাওয়া যায় না, কিন্তু অর্থনৈতিক ফায়দা লুণ্ঠন, পদ-পদবি দখল বা ক্ষমতার সুবিধা নেওয়ার সময় তারা সবচেয়ে সামনের সারিতে অবস্থান নেন। • সাংস্কৃতিক বিমুখতা: যেকোনো অসাম্প্রদায়িক উৎসব, শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধা নিবেদন কিংবা প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আয়োজনকে তারা এড়িয়ে চলেন অথবা প্রচ্ছন্নভাবে অবজ্ঞা করেন। • প্রাক-রাজনৈতিক সংস্কারের তোষণ: তারা সুকৌশলে আওয়ামী লীগের প্রগতিশীল ভাবাদর্শের মূল ভিত্তিগুলোকে শিথিল করার চেষ্টা করেন এবং দলের নীতিমালায় মৌলবাদী দৃষ্টিভঙ্গির তোষণ ঘটান।

৭. আইনি ও সাংবিধানিক লড়াই: আইনের শাসন বনাম সহিংস প্রতিশোধ রাজনীতিতে মৌলবাদী বা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে মোকাবিলা করার নামে নিজেরা যদি একই রকম হিংস্র, বেআইনি ও অগণতান্ত্রিক পথ অবলম্বন করা হয়, তবে তা হিতে বিপরীত হয়। ইতিহাস প্রমাণ করে, বেআইনি দমনপীড়ন বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দিয়ে মৌলবাদ দমন করা যায় না; বরং তা ভুক্তভোগীদের প্রতি জনমনে সহানুভূতি তৈরি করে। ফরাসি আলোকিত যুগের দার্শনিক ভলতেয়ারের আইনি শাসন ও সহনশীলতার নীতি এখানে প্রণিধানযোগ্য। রাষ্ট্র যখন তার গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক নৈতিকতা হারিয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে, তখন তা প্রকারান্তরে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হাতেই অস্ত্র তুলে দেয়। প্রগতিশীল শক্তির প্রধান বল হলো তার আইনি ও নৈতিক স্বচ্ছতা। মৌলবাদী ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই হতে হবে সম্পূর্ণ সাংবিধানিক, আইনি এবং মেধাভিত্তিক। অপরাধীদের বিচার হতে হবে সর্বজনীন আইনের আওতায় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। আইনি কাঠামোর সঠিক প্রয়োগ এবং যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমেই কেবল অপশক্তিকে পরাস্ত করা সম্ভব, অন্ধ আক্রোশ বা ব্যক্তিগত প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়।

৮. মনস্তাত্ত্বিক আত্মবিশ্বাস ও আদর্শিক দৃঢ়তা

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থকরা যখন দীর্ঘ দিন ধরে আদর্শিক সংকটে ভোগেন, তখন তাদের মধ্যে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক হীনমন্যতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়। প্রতিপক্ষের কুৎসিত অপপ্রচার, ইন্টারনেট বিভ্রান্তি এবং সামাজিক চাপের মুখে তারা নিজেদের প্রগতিশীল পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন। এটি রাজনৈতিক লড়াইয়ের মাঠে একটি বড় পরাজয়ের লক্ষণ। ইতিহাসের যেকোনো সন্ধিক্ষণে প্রগতিশীল ভাবাদর্শই মানবজাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। কুসংস্কার, মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতা সাময়িকভাবে সমাজে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, কিন্তু তা সভ্যতার চূড়ান্ত সমাধান হতে পারে না। এই সত্যকে আওয়ামী লীগের প্রতিটি কর্মীর হৃদয়ে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রধান নৈতিক ভিত্তি। কর্মীদের এই আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হবে যে তারা যে নীতিতে বিশ্বাস করেন, তা বিশ্বসভ্যতার অগ্রগতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এই মনস্তাত্ত্বিক আত্মবিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে প্রতিপক্ষের কোনো মিথ্যে অপপ্রচারই কর্মীদের বিভ্রান্ত করতে পারবে না।

৯. আদর্শিক পুনর্গঠন: প্রগতিশীল রাজনীতির কৌশলগত পথনকশা সমকালীন রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও অনুপ্রবেশের সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে এক ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও আদর্শিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কেবল ক্ষণস্থায়ী নির্বাচনী সমঝোতা বা ক্ষমতার কৌশল দিয়ে এই স্থায়ী ক্ষত নিরাময় করা সম্ভব নয়। এর জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পথনকশা গ্রহণ করা জরুরি: 1. রাজনৈতিক শিক্ষা ও তাত্ত্বিক পাঠশালা: দলের সকল স্তরের কর্মীদের জন্য রাজনীতি, ইতিহাস, সংবিধান ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ওপর নিয়মিত তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাত্ত্বিক জ্ঞান ছাড়া আদর্শিক আনুগত্য ধরে রাখা সম্ভব নয়। 2. সাংস্কৃতিক ধারার পুনরুজ্জীবন: রাজনীতিকে কেবল মিছিল-মিটিংয়ের মধ্যে বন্দি না রেখে নাটক, সংগীত, সাহিত্য ও খেলাধুলার মাধ্যমে তৃণমূল মানুষের সাথে যুক্ত করতে হবে। 3. পদায়ন ও মূল্যায়নে কঠোরতা: সংগঠনে দায়িত্ব বা পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে কেবল অন্ধ আনুগত্য বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা না দেখে ব্যক্তির প্রগতিশীল ভাবাদর্শিক নিষ্ঠা ও অতীত রেকর্ড কঠোরভাবে পরীক্ষা করা দরকার। 4. ডিজিটাল মাধ্যমে যুক্তিনির্ভর উপস্থিতি: বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, সঠিক ইতিহাস ও আধুনিক তথ্য দিয়ে অনলাইন মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দর্শনের পক্ষে শক্তিশালী উপস্থিতি গড়ে তুলতে হবে।

১০. ইতিহাসের শিক্ষা, জনআকাঙ্ক্ষা ও প্রগতির ভবিষ্যৎ ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হলো—যে দল বা রাজনৈতিক ধারা তার মূল চেতনা ও আদর্শিক ভিত্তি বিসর্জন দিয়ে কেবল ক্ষমতার তাৎক্ষণিক মোহে অন্ধ হয়ে পড়ে, ইতিহাস তাকে কোনো ক্ষমা করে না। প্রগতিশীলতার চরম সংকটময় এই সময়ে ছদ্মবেশী মৌলবাদ ও অভ্যন্তরীণ 'জামায়াতীকরণ'-এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো কেবল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অস্তিত্বের লড়াই নয়, এটি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র রক্ষা করার লড়াই।

সংকট যত গভীরই হোক না কেন, সমাধানের পথ রাজনীতির অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও ঐতিহাসিক ভিত্তির কাছে ফিরে যাওয়ার মধ্যেই নিহিত। প্রতিক্রিয়াশীলদের ক্ষণস্থায়ী জয় দেখে হতাশ না হয়ে ধৈর্য, তাত্ত্বিক দৃঢ়তা এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে জনমানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।

বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ চূড়ান্ত বিচারকের ভূমিকা পালন করে। তারা যখন দেখবে যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সত্যি সত্যি তাদের অধিকার, অসাম্প্রদায়িক ভবিষ্যৎ এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষায় আপসহীন—তখন তারা আবারও প্রগতিশীল রাজনীতির পতাকাতলে একত্রিত হবে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, অর্থাৎ ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতিকে ধারণ করে যদি দলটি নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পারে, তবেই ছদ্মবেশী মৌলবাদের পরাজয় ঘটবে এবং একটি উন্নত, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথ সুগম হবে।

লেখক: ঈশ্বর ভট্টাচার্য, কবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক