মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে দুদকের আসামির তালিকায়: আসিফ মাহমুদের রাজনৈতিক উত্থান ও বিতর্ক

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৩৯ পিএম
দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে দুদকের আসামির তালিকায়: আসিফ মাহমুদের রাজনৈতিক উত্থান ও বিতর্ক

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিরুদ্ধে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা চাওয়ার আলটিমেটাম এবং মানহানির মামলার হুমকি—সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের এমন অবস্থান রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে চরম উত্তাপ ছড়িয়েছে। মাত্র ১৩ মাস আগে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে যিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে এসেছিলেন, আজ তিনি নিজেই দুই কোটি ৭৬ লাখ টাকার দুর্নীতির অনুসন্ধানের মুখে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, তদন্তের মুখোমুখি না হয়ে তদন্তকারী সংস্থাকেই মামলার হুমকি কেন?

দুদকের অভিযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম

দুদকের অনুসন্ধানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে দুটি বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে, যার মোট আর্থিক পরিমাণ দুই কোটি ৭৬ লাখ টাকা।

• কর্মকর্তাদের পদায়ন ও বাতিলের অর্থ লেনদেন: • ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিলে ৭৬ লাখ টাকা এবং ১৫-২০ জনকে পদোন্নতি দেওয়ার মাধ্যমে দুই কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। • দায়ীদের তালিকা: উক্ত অভিযোগে চারজনকে দায়ী করা হয়েছে—তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ, তৎকালীন সচিব, একজন যুগ্ম সচিব এবং একজন উপসচিব।

আসিফ মাহমুদের ব্যাখ্যা ও আমলাতান্ত্রিক অসঙ্গতি

অভিযোগের জবাবে আসিফ মাহমুদ জানান, তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে কাউকে সরাননি; বরং ২০২১ সালে দেওয়া অবৈধ চলতি দায়িত্ব বাতিলের ২০২১ ও ২০২৫ সালের আদালতের রায় বাস্তবায়ন করেছেন। পদোন্নতির বিষয়ে তিনি পিএসসির সুপারিশের কথা উল্লেখ করেন।

তিনি আরও দাবি করেন, উপজেলা পর্যায়ের পদায়ন সচিব পর্যায়ে নির্ধারিত হয় এবং উপদেষ্টা হিসেবে তিনি সাইনিং অথরিটি ছিলেন না। তবে প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের পুরোনো খেলা হলো ফাইনালে সই করেন সচিব, কিন্তু অদৃশ্য নির্দেশনা আসে উপর থেকে। যদি উপদেষ্টার কোনো প্রশাসনিক সংশ্লিষ্টতাই না থাকে, তবে অনুসন্ধানে তার নাম কেন এল—এ প্রশ্ন রয়েই যায়।

সহকারী একান্ত সচিবের শতকোটির কাণ্ড ও ব্যাংকিং নজরদারি

আসিফ মাহমুদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এটিই প্রথম বিতর্ক নয়। এর আগেও একাধিক গুরুতর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে উঠেছে:

• এপিএস কাণ্ড: • তার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে পদ-পদবি ব্যবহার করে শতকোটি টাকার টেন্ডার ও তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি গড়ালে তাকে বরখাস্ত করা হয় এবং আদালত তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয়। প্রশ্ন জাগে, একজন এপিএস যখন শতকোটি টাকার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে, তখন তা মন্ত্রীর বা উপদেষ্টার অগোচরে থাকা কতটা যুক্তিযুক্ত?

• ব্যাংক হিসাব তলব:

• বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) আসিফ মাহমুদ ও তার পরিবারের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করে। ফেসবুকে তিনি ১৫ লাখ টাকা থাকার দাবি করলেও, অন্তরালে বিশাল আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নিয়ে চর্চা বন্ধ হয়নি।

সরকারি আবাসন বিতর্ক ও 'ডিপ স্টেট' রাজনীতি

উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের পরও ঢাকার হেয়ার রোডের সরকারি বাসভবন 'নিলয়-৬' দীর্ঘদিন দখলে রাখা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। পদত্যাগের ২১ দিন পরও সরকারি সুবিধা ভোগ করা একজন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের নেতার নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এছাড়া, গত সপ্তাহে তিনি দাবি করেন যে 'ডিপ স্টেট' তাকে সরকারের মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর রাজনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছিল। এই বক্তব্য স্পষ্ট করে যে তিনি ক্ষমতার বলয়ে থাকাকালে নানা প্রভাবশালী মহলের সংস্পর্শে ছিলেন।

আইনি হুমকি নাকি তদন্ত এড়ানোর কৌশল?

অভিযোগ উঠলেই মানহানির মামলার হুমকি দেওয়ার প্রবণতা তদন্ত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। দুদকের উপ-পরিচালকের অসাবধানতাবশত দেওয়া মন্তব্য নিশ্চয়ই প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বহীনতা, কিন্তু সেটিকে কেন্দ্র করে সংস্থাটিকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া তদন্তে সহযোগিতার মানসিকতা নির্দেশ করে না।

আসিফ মাহমুদ ফাইল সই না করার কথা বললেও, প্রশাসনিক দুর্নীতির বড় অংশই ঘটে ফাইল এর আড়ালে। একজন রাজনৈতিক নেতার উচিত ছিল আইনি হুমকির পথ না বেছে সব তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ্যে এনে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা।

২৪ ঘণ্টার আলটিমেটামে দুদক ক্ষমা চাইবে কি না তা সময় বলবে, তবে ইতিহাস প্রমাণ করে—আইনি হুমকিতে সাময়িক আড়াল মিললেও জনসাধারণের মনের প্রশ্ন এড়ানো যায় না। এই ঘটনাটি একটি চিরন্তন প্রশ্ন তুলে ধরে: ক্ষমতা কি মানুষকে বদলে দেয়, নাকি ক্ষমতার আলো মানুষের আসল চেহারাটা বের করে আনে?

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)