মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

ঝড়ো হাওয়ায় রক্তাক্ত তৃণমূল: শেখ হাসিনার অবর্তমানে কে ধরবে তরণী?

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:১৪ পিএম
ঝড়ো হাওয়ায় রক্তাক্ত তৃণমূল: শেখ হাসিনার অবর্তমানে কে ধরবে তরণী?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেবল কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দল নয়; দীর্ঘ সংগ্রাম, রাজপথের রক্ত ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ঝড়ের আবর্তে গড়ে ওঠা এক সুবিশাল ইতিহাসের নাম। কিন্তু সাম্প্রতিককালের নজিরবিহীন রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং কোটি সমর্থকের হৃদয়ের স্পন্দন, দেশনেত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য অনুপস্থিতি কিংবা কারাবরণের গুঞ্জনকে ঘিরে আজ তৃণমূল থেকে রাজপথ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এক বুকচাপা কান্না, অনিশ্চয়তা আর হাহাকার। যে দলের কর্মীরা রাজপথে রক্ত দিয়ে টিকে থেকেছে, আজ তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে দিকভ্রান্ত, পথহারা।

সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যম 'দ্য ওয়াল'-এর প্রবীণ সাংবাদিক অমল সরকারের সাথে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক দীর্ঘ ফোনালাপের অডিও জনসমক্ষে আসার পর পুরো রাজনীতিতে যেন এক কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেছে। একটি খবর দাবানলের মতো দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে—নেত্রীর অনুপস্থিতিতে কিংবা অবর্তমানে দলটির কাণ্ডারী হতে যাচ্ছেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম।

এই একটি মাত্র বার্তা প্রকাশ পাওয়ার পর রাজপথের ত্যাগী কর্মীদের জমে থাকা আবেগ, বছরের পর বছর ধরে লালন করা অন্ধ আনুগত্য এবং তৃণমূলের বুকচাপা ক্ষোভ আজ মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। বিদেশে বসে রাজনীতি পরিচালনা, গঠনতন্ত্রের অন্ধ অলিগলি আর পারিবারিক উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ আজ তার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন, বেদনাবিধুর ও আবেগঘন এক সন্ধিক্ষণে এসে উপস্থিত হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিঃশব্দ কান্নায় যে প্রতিক্রিয়া ভেসে আসছে, তা বিশ্লেষণ করলে পাঁচটি স্পষ্ট ও আবেগঘন স্রোত চোখে পড়ে:

১. নিয়মের বেড়াজাল ও গঠনতান্ত্রিক বাস্তবতা একটি দল যখন অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, তখন আবেগের চেয়ে নিয়ম বড় হয়ে দাঁড়ায়—এমনটাই বিশ্বাস একশ্রেণীর সমর্থকদের। জ্যেষ্ঠ নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বা মতিয়া চৌধুরীর প্রয়াণ এবং শীর্ষ প্রেসিডিয়াম সদস্যদের বন্দিদশার পর শেখ সেলিমই সর্বোচ্চ জ্যেষ্ঠ সদস্য। ২০০৭ সালের ১/১১-এর সেই অন্ধকার সময়ে যেমন জিল্লুর রহমান জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে দলের হাল ধরেছিলেন, ঠিক তেমনই শেখ হাসিনাকে ছাড়া এই কঠিন সময়ে গঠনতান্ত্রিক নিয়ম মেনে চলাই একমাত্র উপায় বলে মনে করছেন অনেকে।

২. শেখ হাসিনার প্রতি অন্ধ ভালোবাসা ও চরম আত্মত্যাগ

তৃণমূলের বড় একটি অংশ কোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বোঝে না। তাদের কাছে 'শেখ হাসিনা' কোনো পদের নাম নয়, একটি বিশ্বাসের নাম। রক্তভেজা শার্ট গায়ে জড়িয়ে থাকা কর্মীদের আকুল কণ্ঠস্বর—"নেত্রী যাকে নির্দেশ দেবেন, আমরা তাকেই নেতা মানবো। তিনি যদি একটি কলাপাতাকেও আমাদের মাথার ওপর দাঁড় করিয়ে দেন, তবে কর্মী হিসেবে আমরা জীবন দেবো কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত অমান্য করবো না।" নেত্রীর দূরদর্শিতার ওপর এই অন্ধ বিশ্বাসই আজ তৃণমূলের মূল শক্তি।

৩. ষড়যন্ত্রের সন্দেহ ও বিভ্রান্তির মেঘ সাংবাদিকতার নেপথ্যে কোনো চক্রান্ত আছে কি না, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত একঝাঁক সচেতন কর্মী। তাদের মতে, অডিও কথোপকথনে জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে এলেও প্রচার মাধ্যমে সেটিকে অহেতুক 'টুইস্ট' করা হয়েছে। বিদেশে বসে বা কৌশলের খেলায় এই ঐতিহ্যবাহী দলকে পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়; বরং এটি কর্মীদের অমূল্য মনোবল ভেঙে দেওয়ার এক সূক্ষ্ম চক্রান্ত হতে পারে।

৪. তারুণ্যের স্বপ্ন ও 'সজীব ওয়াজেদ জয়'-এর আহ্বান রাজনীতিতে পুরনো ও বিতর্কিত সিন্ডিকেটের পতন চেয়ে তরুণদের চোখ এখন নতুন দিগন্তে। উপমহাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক পরিবারের মতোই যদি নেতৃত্বের ব্যাটন হস্তান্তর করতেই হয়, তবে রাজপথের তরুণদের প্রথম পছন্দ সজীব ওয়াজেদ জয়। বিতর্কিত আত্মীয়দের হাতে নেতৃত্ব সঁপে দিলে দল ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। যদি বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কাউকেই দরকার হয়, তবে দূরদর্শী ও আধুনিক ভাবনার জয়ই তৃণমূলের শেষ ভরসাস্থল।

৫. রাজপথের নিঃস্ব কর্মীদের হাহাকার ও ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সুরটি এসেছে সেইসব নিঃস্ব, ঘরছাঁড়া ও রক্তভেজা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাছ থেকে, যারা রাজনৈতিক ঝড়ের মুখে বুকের রক্ত দিয়ে রাজপথ আগলে রেখেছেন। তাদের স্পষ্ট আর্তনাদ—"নেত্রীর সবচেয়ে বড় ভুল ছিল আত্মীয়দের অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেওয়া।" এসি রুমে বসে রাজনীতি করা বা স্বজনপ্রীতির বলয়কে আজকের নির্যাতিত তৃণমূল আর মেনে নেবে না। বিতর্কিত কোনো মুখের হাতে দল গেলে দীর্ঘ সংগ্রামের ঐতিহ্য চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

আওয়ামী লীগের ইতিহাস আন্দোলন, লড়াই ও রক্তদানের ইতিহাস। কিন্তু আজকের এই অন্ধকার মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের রক্তভেজা কর্মীরা যে প্রশ্ন তুলছেন, তা কেবল পদ-পদবীর প্রশ্ন নয়—তা আজ তাদের অস্তিত্ব ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। গঠনতন্ত্রের দোহাই দিয়ে কাউকে বসানো হয়তো সহজ, কিন্তু মাঠের নিঃস্ব কর্মীদের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা যে বড্ড কঠিন। নেত্রীর একটি ইঙ্গিত কিংবা সংবাদমাধ্যমের গুঞ্জন সাময়িক ঝড়ের জন্ম দিতে পারে, কিন্তু দিনশেষে রাজপথে লড়াই করার জন্য প্রয়োজন এক সর্বজনগ্রাহ্য, ত্যাগী ও সৎ অভিভাবক। আত্মঘাতী আত্মীয়করণ নাকি নবাগত দিনের সূর্য—আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব এখন এই এক চরম সিদ্ধান্তের ওপরই ঝুলছে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)