শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

ছয় বছরের প্রতীক্ষার শেষে— দরজা খুলে ইতিহাসের ফিরে আসা

লিখেছেন: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১:২৬ পিএম
ছয় বছরের প্রতীক্ষার শেষে— দরজা খুলে ইতিহাসের ফিরে আসা

প্রায় ছয় বছর পর। সময়ের দীর্ঘ ব্যবধান, ইতিহাসের নির্মম বাঁক, অসংখ্য স্মৃতি আর অপ্রকাশিত বেদনার ভার বয়ে আমি অপেক্ষা করছিলাম সেই মুহূর্তটির জন্য। হঠাৎ দরজাটি ধীরে খুলে গেল। রবীন্দ্রনাথের মতো ধীর পায়ে কক্ষে প্রবেশ করলেন তিনি। একটি ক্ষণ—হয়তো মাত্র কয়েকটি সেকেন্ড—কিন্তু আমার কাছে সেটি যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনন্ত মুহূর্ত। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখছিলাম, অথচ বিশ্বাস করতে পারছিলাম না—এ কি সত্যিই দেখা, নাকি দীর্ঘ ছয় বছরের আকুল প্রতীক্ষা আমার চোখে কোনো স্বপ্ন এঁকে দিয়েছে? আমি নির্বাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। কোনো কথা মনে আসেনি। ভাষা যেন বুকের ভেতর কোথাও থেমে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, সময় তার সমস্ত গতি থামিয়ে দিয়েছে, চারপাশের সব শব্দ মিলিয়ে গেছে নিস্তব্ধতায়, আর পৃথিবী সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই দরজার চৌকাঠ আর তাঁর শান্ত উপস্থিতির মধ্যে। সেই মুহূর্তে কোনো আনুষ্ঠানিক সম্ভাষণ ছিল না। ছিল শুধু এক গভীর বিস্ময়, এক অদ্ভুত আবেগ আর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার নীরব অভিঘাত। বহু ঝড়, বহু অপবাদ, বহু বিচ্ছেদ আর অসহনীয় প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে আসা একজন মানুষ আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেই মুহূর্তে আমি একজন মানুষকে শুধু দেখিনি; দেখেছিলাম সময়ের নির্দয় পরীক্ষায় অবিচল এক মুখ, ঝড় পেরিয়েও নিভে না-যাওয়া এক প্রদীপের শিখা। বহু স্মৃতি, বহু পথচলা, বহু অপ্রকাশিত বেদনা আর অগণিত মানুষের আশা যেন তাঁর নীরব পদচারণার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে প্রবেশ করেছিল। মনে হচ্ছিল, বাস্তব আর স্মৃতির সীমানা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ইতিহাসের একটি অধ্যায় যেন দীর্ঘ বিরতির পর আবার হেঁটে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়েছে। একটি পরিচিত অধ্যায়ের পাতা যেন আবার উল্টে গেছে—যেখানে শব্দের চেয়ে নীরবতাই বেশি বাগ্মী, আর চোখের ভাষাই সবচেয়ে সত্য। আমার বিস্ময় তখন আর কেবল বিস্ময় ছিল না; তা রূপ নিয়েছিল এক গভীর অনুভবে। উপলব্ধি করলাম—কিছু সাক্ষাৎ শুধু মানুষে মানুষে হয় না; কিছু সাক্ষাৎ হয়ে ওঠে স্মৃতি, ইতিহাস এবং অনুভূতির এক অবিস্মরণীয় মিলন। আজও সেই দরজা খোলার মুহূর্তটি মনে পড়লে মনে হয়—জীবনের কিছু দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে না, ভাষাতেও পুরোপুরি ধরা যায় না। তারা শুধু হৃদয়ের গভীরে চিরদিনের জন্য স্থির হয়ে থাকে—একটি আলোকিত, অনির্বচনীয় স্মৃতি হয়ে। প্রায় ছয় বছর পর। অপেক্ষারও একটি নিজস্ব শব্দ থাকে। সেই শব্দ আমি শুনেছিলাম সেদিন—নিঃশব্দে।

লেখক: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন, প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা