বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

স্বাস্থ্য

জনগণের পকেট খালি করে করপোরেট তোষণ: ওষুধ নীতিতে স্বাস্থ্যের বদলে বাণিজ্যই জয়ী! একটি দেশের সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার শেষ ভরসাটুকু কোথায় থাকে?

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৭ পিএম
জনগণের পকেট খালি করে করপোরেট তোষণ: ওষুধ নীতিতে স্বাস্থ্যের বদলে বাণিজ্যই জয়ী! একটি দেশের সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার শেষ ভরসাটুকু কোথায় থাকে?

একটি দেশের সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার শেষ ভরসাটুকু কোথায় থাকে? নিশ্চিতভাবেই তার চিকিৎসা ও ওষুধের ওপর। কিন্তু যখন সেই বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদানটিই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ঠেলে দিয়ে গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর পকেট ভরানোর হাতিয়ার বানানো হয়, তখন তা কেবল নীতিগত ব্যর্থতা থাকে না—তা হয়ে ওঠে কোটি কোটি মানুষের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

প্রশাসনিক দোহাইয়ের আড়ালে ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষা

দীর্ঘ ৩২ বছর পর যখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক বাস্তবতাকে মেনে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ১১৭টি থেকে ২৯৭টিতে উন্নীত করা হয়েছিল, তখন এক বুক আশা বেঁধেছিল দেশের সাধারণ মানুষ। কিন্তু সে আশার আলো নিভতে সময় লাগেনি। 'জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়া হয়নি'—এমন একটি পদ্ধতিগত অজুহাত সামনে এনে গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভার এক ঝটকা সিদ্ধান্তে সেই সম্প্রসারিত তালিকা বাতিল করে দেওয়া হলো।

অথচ কী নৃশংস সত্য লুকিয়ে আছে এই অজুহাতের পেছনে! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান ও ওই পরিষদের সদস্য ড. জাকির আহমেদ চৌধুরী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, নতুন সরকার উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের পর আজ পর্যন্ত তাদের একটা সভাও ডাকেনি। যে পরামর্শ না নেওয়ার অভিযোগে আগের তালিকা ফেলা হলো, ঠিক একই 'ভুল' করে বর্তমান সরকারও পরিষদকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে সিদ্ধান্ত নিল। পরিষ্কার বোঝা যায়, এটা আইনি ত্রুটি সংশোধন নয়; বরং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওষুধ ব্যবসায়ীদের বহুদিনের দাবি মেটানোর এক নির্লজ্জ মহড়া।

৩২ বছর আগের তালিকায় ফেরা মানেই স্বাস্থ্যখাতকে ধ্বংসের মুখে ফেলা

আধুনিক যুগে ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিংবা হৃদরোগের মতো জটিলব্যাধি ঘরে ঘরে। অন্তর্বর্তী সরকারের ২৯৭টি ওষুধের তালিকায় এসব জটিল ও জীবন রক্ষাকারী আধুনিক ওষুধ অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেন সরকার এগুলোর দাম নির্ধারণ করে দিতে পারে। কিন্তু সরকার আজ দেশকে ঠেলে দিল ১৯৯৪ সালের পুরোনো ১১৭টি ওষুধের তালিকায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেখানে গত ৩০ বছরে আমূল বদলে গেছে, সেখানে তিন দশক পুরোনো তালিকায় ফেরত যাওয়া কি চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নয়? ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৯৯৪ সালের সেই ১১৭টি ওষুধের মধ্যে বর্তমানে দেশীয় বাজারে পাওয়া যায় মাত্র ৩০টির মতো। বাকি ওষুধগুলোর এখন উৎপাদনেই নেই! অর্থাৎ, এই তালিকার ওপর ভিত্তি করে সাধারণ মানুষ কোনো সাশ্রয়ী বা কার্যকর ওষুধ পাবে না। ফলে বাজারে থাকা আধুনিক ওষুধগুলোর দাম নির্ধারণের একচ্ছত্র ক্ষমতা আবার চলে গেল সিন্ডিকেট ও ওষুধ কোম্পানিগুলোর হাতে।

নজরদারির অভাব এবং মধ্যবিত্ত ও দরিদ্রের ওপর চাবুক

আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতে ওষুধের দাম তদারকি করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সরকারের এমনিতেই দুর্বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. সুফিয়ান নাহিন শিমুল যেমনটি তুলে ধরেছেন—একটি প্যারাসিটামলের সাধারণ রূপ তালিকায় থাকলেও কোম্পানিগুলো 'এক্সট্রা' বা 'এক্সটেন্ডেড' ট্যাগ লাগিয়ে দ্বিগুণ দামে বাজারে বেচছে। এই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে রাষ্ট্র যখন ২৯৭টি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের হাত থেকে গুটিয়ে নেয়, তখন সাধারণ মানুষের পকেট কেটে রক্ত চোষার ষোলো কলা পূর্ণ হয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন সত্যটি অনায়াসেই উন্মোচন করেছেন—ভুল থাকলে বিশেষজ্ঞ কমিটি বসিয়ে তা সংশোধন করা যেত। কিন্তু পুরো নীতিমালাটাই কবরে পাঠিয়ে দেওয়া প্রমাণ করে, এখানে সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্যের চেয়ে ওষুধ শিল্পের বাণিজ্যিক সুবিধাকেই মাথায় তুলে রাখা হয়েছে।

নীরবতায় ঢাকা দায়বদ্ধতা

এই এক সিদ্ধান্তে দেশের কোটি কোটি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস ভারী হচ্ছে। প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় জীবনের ওষুধ কিনতে গিয়ে যখন একজন বাবাকে সন্তানের পড়ার খরচ কাটছাঁট করতে হবে, তখন কোথায় থাকবে রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা? আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ মুখ খুলছেন না। বারবার যোগাযোগের চেষ্টা সত্ত্বেও সরকারের এই নীরবতা জানিয়ে দেয়—জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে উত্তর দেওয়ার মতো মুখ তাদের নেই।

প্রশাসনিক কৌশলের আড়ালে কোটি মানুষের জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলা বন্ধ হওয়া জরুরি। জনস্বাস্থ্য কোনো করপোরেট মুনাফার জায়গা হতে পারে না। কোনো অজুহাতেই দেশের সাধারণ মানুষকে ওষুধ কোম্পানির জিম্মি বানানো মেনে নেওয়া যায় না।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)