বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

স্বাস্থ্য

নর্দমায় কুড়িয়ে পাওয়া শৈশব: ডাস্টবিনে ফুটছে যে ফুল, রাষ্ট্রের দায়ভার ঠিক কতখানি?

লিখেছেন: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন প্রকাশিত: ৪ আগস্ট ২০২৬, ১:১২ পিএম
নর্দমায় কুড়িয়ে পাওয়া শৈশব: ডাস্টবিনে ফুটছে যে ফুল, রাষ্ট্রের দায়ভার ঠিক কতখানি?

যে জন্ম হওয়ার কথা ছিল উৎফুল্ল আনন্দের, যে আগমন ঘিরে একটি পরিবারে বাজারজুড়ে মিষ্টি বিলানোর কথা ছিল—সেই নিষ্পাপ প্রাণগুলো আজ ঠাঁই পাচ্ছে ফুটপাতের ধূলিবালি, নির্জন ঝোপঝাড় কিংবা দুর্গন্ধময় ডাস্টবিনে! দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাস্তাঘাটে পরিত্যক্ত অবস্থায় নবজাতক উদ্ধারের ঘটনা শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং মানবিক সমাজ হিসেবে আমাদের নৈতিক দেউলিয়াত্বের এক করুণ চিত্র তুলে ধরছে। পলিথিনে মোড়ানো সেই তুলতুলে শরীরগুলো যখন হাসপাতালের বেডে কিংবা ছোটমণি নিবাসে একটু উষ্ণতার জন্য কাঁদে, তখন প্রশ্ন জাগে—আমাদের মানবিক বিবেক আর রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা কি তবে কেবলই কাগুজে এক শব্দ?

এক ফোঁটা আলোর খোঁজে পলিথিনে মোড়ানো শৈশব

পরিত্যাগের এই নিষ্ঠুর খেলায় সবচেয়ে বড় শিকার—ফুটফুটে কন্যাশিশু, শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশু কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের দায় কাঁধে নিয়ে পৃথিবীতে আসা নিষ্পাপ প্রাণগুলো। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই দেশের নানা প্রাপ্ত থেকে ৪৪টি নবজাতককে জীবিত ও মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসেই অন্তত আটটি শিশুর কান্নার আওয়াজ পৌঁছেছে লোকালয়ে।

গত ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে যখন নিথর হয়ে আসার উপক্রম এক কন্যাসন্তানকে পলিথিনের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়, তখন হয়তো সে খুঁজছিল মায়ের আঁচলের একটু ওম। ঠিক তার কয়েক দিন আগে, ২২ জুলাই, স্বপ্নের বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটপাতে পাওয়া যায় এক নবজাতকের নিচ্ছ্বল মরদেহ। আর শ্যামপুর ব্রিজের নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া শিশু ‘আলী’ এখন ঠাঁই পেয়েছে আজিমপুর ছোটমণি নিবাসে। নিবাসের কর্তাব্যক্তিরা জানান, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত কেবল তাদের দরজাতেই এসে পৌঁছেছে এমন ১৯টি অনাথ প্রাণ।

এমএসএফ-এর তথ্য কর্মকর্তা মালিহা হেলাল তীরা জানান, গ্রাম কিংবা শহর—সর্বত্রই অকাতরে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে এই নতুন প্রাণগুলোকে। তবে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার মতো শহরাঞ্চলে এই নির্মমতার মাত্রা যেন আরও ভয়াবহ।

কেন রক্তের বাঁধন ছিঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা হয় এই প্রাণগুলোকে?

কেন জন্মদাত্রী মা কিংবা পরিবার নিজের রক্তের সন্তানকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়? শিশু অধিকার ফোরামের ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুজ্জামান কামাল করুণ এই বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ করে বলেন, “কন্যাসন্তানকে এখনও সমাজের একাংশ পরম আশীর্বাদ না ভেবে ‘বোঝা’ মনে করে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে চরম দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা, অসামাজিক লজ্জা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত মাতৃত্বের গ্লানি। ফলে যে শিশুর আগমনে উৎসব হওয়ার কথা ছিল, সে শিশুটিই হারিয়ে যাচ্ছে আঁধার গলিতে।”

কাঠগড়ায় সমাজ ও রাষ্ট্র: আমাদের করণীয় কী?

জন্ম দেওয়ার পরই যে মা-বাবা সন্তানকে ডাস্টবিনে ফেলে যায়, তারা অপরাধী সন্দেহ নেই। কিন্তু যে সমাজ ও রাষ্ট্র একটি শিশুকে নিরাপদে বেড়ে ওঠার ন্যূনতম সুরক্ষা দিতে পারে না, তাদের দায়ও কি কোনো অংশে কম?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল আফসোস আর আহাজারি করে এই নির্মমতা থামানো যাবে না।

• প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি: অপরাধীদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও প্রযুক্তির কঠোর ব্যবহার বাড়াতে হবে।

• কঠোর আইন ও বিচার: সন্তান পরিত্যাগকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর সঠিক প্রয়োগ চাই। • নিরাপদ আশ্রয় ও আইনি দত্তক প্রথা: অনাকাঙ্ক্ষিত শিশু যেন রাস্তায় না ফেলা হয়, সেজন্য নিরাপদ হস্তান্তরের গোপন ব্যবস্থা এবং দত্তক নেওয়ার প্রক্রিয়াকে আইনিভাবে আরও সহজ ও মানবিক করা জরুরি।

ডাস্টবিনে কুড়িয়ে পাওয়া ওই ছোট্ট হাতগুলো হয়তো আজ সমাজের প্রতি কোনো নালিশ জানাতে পারছে না, কিন্তু তাদের নীরব কান্না আমাদের সভ্যতার গায়ে প্রতিদিন এক একটি বড় কলঙ্কের দাগ এঁকে দিচ্ছে। রাষ্ট্র ও সমাজের অভিভাবকরা কি এবার জাগবেন? নাকি পলিথিনে মোড়ানো এই শৈশবগুলো এভাবেই ধুঁকে ধুঁকে মরবে রাস্তার ধারে?

লেখক: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন, প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা