রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

স্বাস্থ্য

বিশ্বমঞ্চে বিরল সম্মান আর দেশের আঙিনায় অবমূল্যায়ন: ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহর প্রাপ্তি ও আমাদের সংকীর্ণতা

লিখেছেন: এ বি এম কামরুল হাসান প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ৩:২৬ পিএম
বিশ্বমঞ্চে বিরল সম্মান আর দেশের আঙিনায় অবমূল্যায়ন: ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহর প্রাপ্তি ও আমাদের সংকীর্ণতা

বিশ্বমঞ্চে বিরল সম্মান আর দেশের আঙিনায় অবমূল্যায়ন: ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহর প্রাপ্তি ও আমাদের সংকীর্ণতা

দেশের প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও প্রামাণ্য মেডিকেল পাঠ্যগ্রন্থ "Davidson's Principles and Practice of Medicine"-এর ২৫তম সংস্করণের ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি বা এডিটরিয়াল বোর্ডের সদস্য হিসেবে তিনি পুনরায় যুক্ত হয়েছেন। উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে সমাদৃত এই বইটির ২৪তম সংস্করণটি ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল এবং সর্বশেষ ২৫তম সংস্করণটি ২০২৬ সালের ২৩ জুন প্রকাশিত হয়েছিল। এর আগের ২৪তম সংস্করণেও তিনি বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

শুধু তাই নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের আরেকটি বিশ্বখ্যাত পাঠ্যগ্রন্থ "Kumar & Clark’s Clinical Medicine"-এর ১১তম সংস্করণের আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা পরিষদেও (International Advisory Board) তাঁর নাম রয়েছে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এলসেভিয়ারের (Elsevier) তথ্য অনুযায়ী, এই বইটির ১১তম সংস্করণটি ২০২৫ সালের জুন ও জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে আসে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক একাধিক স্ট্যান্ডার্ড মেডিকেল টেক্সটবুকের নীতিনির্ধারণী বোর্ডে একজন বাংলাদেশি চিকিৎসকের এই ধারাবাহিক ও মর্যাদাপূর্ণ উপস্থিতি চিকিৎসকদের জন্য অবশ্যই এক গর্বের অর্জন।

অথচ আন্তর্জাতিক অঙ্গন যখন একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকের মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করছে, ঠিক তখনই দেশের আঙিনায় তাঁর প্রতি ভিন্ন এক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) কর্তৃপক্ষ তাঁর 'ইমেরিটাস অধ্যাপক'-এর আজীবন নিয়োগ বাতিল করেছে এবং একই সঙ্গে উত্তোলিত সব বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

কর্তৃপক্ষের দাবি—২০২৪ সালে সিন্ডিকেটের ৯২তম বাজেট অধিবেশনে নিয়মবহির্ভূত ও আলোচ্যসূচির বাইরে গিয়ে তাঁকে আজীবন 'ইমেরিটাস প্রফেসর' করা হয়েছিল। তবে প্রশাসনিক এই মারপ্যাঁচের আড়ালে রাজনৈতিক জিঘাংসা কাজ করছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে জোরালোভাবে। বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হওয়ার কারণেই কি আজ তাঁকে বর্তমান প্রশাসনের রাজনৈতিক বলির শিকার হতে হলো? শুধু পদ কেড়েই ক্ষান্ত না হয়ে তাঁর অতীতের বেতন-ভাতা পর্যন্ত ফেরত চাওয়ার হঠকারী নির্দেশটিকে অনেকেই নজিরবিহীন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলেই মনে করছেন।

প্রশ্ন হলো—এই সিদ্ধান্ত কি আদতে যুক্তিযুক্ত ছিল? প্রশাসনিক বা আইনি মারপ্যাঁচে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের যুক্তি দেখানো হলেও, দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর অবদান এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি বিবেচনা করলে এই ধরনের সিদ্ধান্ত বড় বেশি যান্ত্রিক ও সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচায়ক। একজন শিক্ষক বা গবেষক যদি তার দীর্ঘ কর্মজীবনে দেশের চিকিৎসায় অসামান্য অবদান রেখে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান, তবে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তগুলো হওয়া উচিত আরও উদার ও দূরদর্শী।

এর মাধ্যমে কি দেশবরেণ্য এই চিকিৎসককে অপমানিত করা হয়েছে? ডা. আব্দুল্লাহ নিজেই একটি গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেছেন, "আল্লাহ আমাকে অনেক সম্মান দিয়েছেন... আমার সম্মান কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।" তাঁর এই বক্তব্যে যেমন পেশাগত দৃঢ়তা প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি প্রচ্ছন্নভাবে ফুটে উঠেছে এক ধরনের তীব্র অভিমান। প্রাতিষ্ঠানিক পদ-পদবি বা রাজনৈতিক পালাবদলের মাধ্যমে হয়তো প্রশাসনিক সিন্ধান্ত পরিবর্তন করা সম্ভব, কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে তাঁর দীর্ঘ সাধনা এবং বিশ্বখ্যাত 'ডেভিডসন' গ্রন্থের এডিটরিয়াল বোর্ডে তাঁর অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে সত্যিকারের মেধাকে স্থানীয় সীমানায় আটকে রাখা যায় না।

পরিশেষে বলা যায়, গুণীজনদের অবমূল্যায়ন বা প্রতিহিংসার শিকার বানানো দেশের সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ ও স্বাস্থ্য খাতের জন্য কোনো ইতিবাচক বার্তা বয়ে আনে না। ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ'র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে তাঁর সম্মান বা অর্জন কোনো একক প্রাতিষ্ঠানিক কাগজপত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং এই ধরনের সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে এসে দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশিষ্ট মুখগুলোকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করাটাই প্রাতিষ্ঠানিক দূরদর্শিতা ও সুস্থ সংস্কৃতির পরিচায়ক হওয়া উচিত।

লেখকঃ এ বি এম কামরুল হাসান, প্রবাসী চিকিৎসক ও কলামিস্ট