মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ঝোড়ো প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত: অক্টোবরের আল্টিমেটাম ও ডিসেম্বরের যাত্রা। দিল্লির সংবাদ সম্মেলন থেকে বেনাপোল ট্রানজিট

লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন। প্রকাশিত: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪২ পিএম
রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ঝোড়ো প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত: অক্টোবরের আল্টিমেটাম ও ডিসেম্বরের যাত্রা। দিল্লির সংবাদ সম্মেলন থেকে বেনাপোল ট্রানজিট

ভারতের মিডিয়া ট্রেইল ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের ‘রেড অ্যালার্ট’

দীর্ঘদিন ধরেই জল্পনা-কল্পনা ছিল—শেখ হাসিনা কীভাবে এবং কখন প্রকাশ্যে আসবেন। ভারতীয় সাংবাদিক মহলের সূত্র উদ্ধৃত করে উঠে এসেছে, তাঁর এই আত্মপ্রকাশ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ইতিমধ্যে একটি অডিও বার্তার মাধ্যমে তাঁর উপস্থিতির সংকেত দেওয়া হয়েছে। নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, আগামী অক্টোবর মাসের নির্দিষ্ট এক সময়ে দিল্লির বুকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এক অভূতপূর্ব সংবাদ সম্মেলন।

এই হাই-প্রোফাইল সংবাদ সম্মেলনের গুরুত্ব বোঝাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর ব্যস্ততার কথা সামনে আনা হয়েছে। বিবিসি, সিএনএন, স্কাই নিউজ, ফক্স নিউজ, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং দ্য গার্ডিয়ানের মতো শীর্ষ সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের বিশেষ শিডিউল ব্লক বা অ্যাডভান্সড সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। এই সংবাদ সম্মেলনেই শেখ হাসিনা তাঁর বাংলাদেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট টাইমলাইন এবং আন্তর্জাতিক বার্তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন কূটনীতি ও পশ্চিমা অক্ষের তৎপরতা

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশল এবং তাঁর সাম্প্রতিক যোগাযোগের পেছনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও প্রভাবশালী কিছু দেশের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, ইতিমধ্যে পশ্চিমা ও ইইউ-ভুক্ত কয়েকটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদের সঙ্গে তাঁর একাধিক বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকায় সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের প্রতিনিধিদের ঝটিকা তৎপরতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বিষয়ে জোরালো দাবি কেবল বাণিজ্যিক কারণে (যেমন বোয়িং বা এয়ারবাস ক্রয় সংক্রান্ত) নয়; এর নেপথ্যে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক এজেন্ডা। ঢাকায় নিযুক্ত এসব দেশের অবস্থান ও সম্প্রতি সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের উৎফুল্ল অভিব্যক্তির ভেতরের সংযোগ বা ‘ডট’ মেলালেই এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ পরিষ্কার হয়।

সড়কপথের ট্রানজিট: বেনাপোল থেকে গোপালগঞ্জ ও পাওয়ার শিফট

সবচেয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাব্য রুট এবং কৌশলগত পরিকল্পনা। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি আকাশপথে না এসে স্থলপথে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেন।

প্রবেশপথ: ভারতের পেট্রাপোল হয়ে বাংলাদেশের বেনাপোল সীমান্ত। সম্ভাব্য তারিখ: ডিসেম্বরের মাঝামাঝি (আন্দাজ করা হচ্ছে ১৪ই ডিসেম্বর বা তার কাছাকাছি সময়ে)।

প্রাথমিক গন্তব্য: গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া।

বিশ্লেষণ বলছে, শেখ হাসিনা যদি পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেন, তবে তার ফ্রিকুয়েন্সি বা রাজনৈতিক প্রভাবে মুহূর্তে লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটতে পারে। তিনি গোপালগঞ্জে অবস্থান গ্রহণ করলে এবং সেখান থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শুরু করলে, দৃশ্যত রাজধানী ঢাকার চেয়ে গোপালগঞ্জই সাময়িকভাবে দেশের মূল রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার শঙ্কা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের পর্যবেক্ষণ হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বর্তমানে বাংলাদেশকে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে না; বরং একে দেখছে সামগ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে। দক্ষিণ এশিয়ার একটি বিপুল জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র যদি কোনো কারণে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মৌলবাদ বা উগ্রপন্থার অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, তবে তা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি তৈরি করবে। ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রসহ পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশকে কোনো চরমপন্থী বা উগ্রপন্থী রাষ্ট্র হতে দিতে রাজি নয়। এই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা শঙ্কাই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পুনরুত্থান ও ফিরে আসার প্রক্রিয়ায় বৈশ্বিক মিত্রদের বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

চরম কূটনৈতিক সংকট ও বিদ্যমান ব্যবস্থার বিনাশকাল

বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনিক চালচিত্র, অর্থনৈতিক সংকট এবং বৈদেশিক নীতির দোলাচল নিয়েও কড়া সমালোচনা উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।

পাক-ভারত বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও ডিজেল সংকট, এমনকি সাম্প্রতিক খাদ্য আমদানির বিষয়গুলো ইঙ্গিত দেয় যে, দেশ এক তীব্র অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার যে আইনি চাপ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছিল, ভারতের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ও চিকিৎসার বিষয়ে পাল্টা শর্ত বা বার্তা দেওয়ায় পরিস্থিতি উল্টো রূপ নিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক সমর্থন হারিয়ে কোনো সরকারই বেশিদিন একতরফা অবস্থান ধরে রাখতে পারে না। বিনাশকালে বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তই বর্তমান শাসনব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

ঝড়ের পূর্বলক্ষণ ও চূড়ান্ত বার্তা

শেখ হাসিনার এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি ভূ-রাজনৈতিক বলয় পরিবর্তনের এক ইঙ্গিত। যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী অক্টোবরের সংবাদ সম্মেলন এবং পরবর্তী কার্যক্রম এগোতে থাকে, তবে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় মোড় এনে দিতে পারে।

যেসব আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ শক্তি মনে করেছিল যে হিসাব চুকে গেছে, তাদের জন্য সামনে হয়তো অপেক্ষা করছে এক নতুন বাস্তবতার ধাক্কা। ইতিহাস এবং ভূ-রাজনীতির বর্তমান গতিপ্রকৃতি অন্তত সেই ঝড়ের পূর্বাভাসই দিচ্ছে।

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।