আলোর পথযাত্রী ছোট্ট প্রাণগুলোর আকুতি: হামের থাবায় ২৪ ঘণ্টায় ঝরে গেল ৮টি তাজা প্রাণ
মায়ের কোলাহল আর কলকাকলিতে মুখরিত থাকার কথা যে শিশুদের, হাসপাতালে শুয়ে ফুসফুস ফাটিয়ে কাঁদা আর মৃত্যুর সঙ্গে লড়েই যেন কাটছে তাদের দিন। থামছে না হামের নির্মম থাবা। গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে আরও আটটি নিষ্পাপ শিশু। চিকিৎসা ও শত চেষ্টার পরও অবুঝ এই শিশুগুলোকে বাঁচানো যায়নি, যা এক গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে প্রতিটি পরিবারে।
২৪ ঘণ্টার ভয়ংকর পরিসংখ্যান: বাড়ছে আক্রান্ত ও ভর্তির হার
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হাম-বিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৪৩ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ হয়েছে ১ হাজার ১০৯ শিশু।
এই এক দিনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে ৮ শিশুর।
শুধু তাই নয়, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৩ শিশু, আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৮২৩ জন।
হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (ICU) আর ওয়ার্ডে শুয়ে থাকা প্রতিটি শিশুর আর্তনাদ যেন দেশবাসীর বিবেককে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল: মার্চের পর থেকে প্রাণ হারিয়েছে ১ হাজার ১শ'র বেশি শিশু
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তার প্রমাণ মেলে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী:
গত ১৫ মার্চ থেকে দেশজুড়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে মোট ১ হাজার ২০ শিশুর।
নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে আরও ১০২ শিশু।
সব মিলিয়ে এই সংকটকালীন সময়ে দেশ হারিয়েছে ১ হাজার ১শ' ২২টি অমূল্য শিশুপ্রাণ।
চিকিৎসকদের মতে, সচেতনতার অভাব এবং সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
লাখ ছাড়িয়েছে সন্দেহজনক রোগী: চিকিৎসকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ
গত ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত দেশজুড়ে মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৯৭ জন। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত করা হয়েছে ২১ হাজার ৬৬৬ জনের রোগ।
পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা অব্যাহত থাকলেও রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। আক্রান্তদের মধ্যে ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হলেও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৫০ জন। চিকিৎসকরা বলছেন, সামান্য সর্দি, জ্বর বা র্যাশকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং টিকাদান কর্মসূচি শতভাগ নিশ্চিত করা না গেলে এই তাণ্ডব থামানো কঠিন হবে।
ঝরে যাওয়া প্রতিটি শিশুর এই চলে যাওয়া কেবল পরিসংখ্যানের একটি সংখ্যা নয়, এটি একেকটি পরিবারের চিরদিনের কান্না। এই প্রাণঘাতী থাবা থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা ও কঠোর স্বাস্থ্যপদক্ষেপ।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
শহর পেরিয়ে এখন গ্রামে গ্রামে কান্নার রোল: ডেঙ্গুর নীরব থাবায় নিভছে নিষ্পাপ শিশুদের জীবনপ্রদীপ
স্বজনদের ভারী নিঃশ্বাস আর অবুঝ শিশুর করুণ বিদায়: ডেঙ্গুতে ৩০০ ছুঁইছুঁই মৃত্যু, হামের থাবায় ঝরলো আরও ৮ তাজা প্রাণ
শিশুদের কান্না আর স্বজন হারানোর মিছিলে ভারী হচ্ছে বাতাস: মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে আমাদের চেনা ঢাকা শহর