শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

দ্রুত উন্নয়নের দিকে ধাবিত দেশটি উল্টো দ্রুত গতিতে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। কূটনৈতিক সাফল্য ও বর্তমান নীতিহীনতার ফলে সৃষ্টি সংকট। দ্বিতীয় পর্ব:

লিখেছেন: অশ্রু হাসি, রাজনীতিবিদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৩৪ পিএম
দ্রুত উন্নয়নের দিকে ধাবিত দেশটি উল্টো দ্রুত গতিতে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। কূটনৈতিক সাফল্য ও বর্তমান নীতিহীনতার ফলে সৃষ্টি সংকট।  দ্বিতীয় পর্ব:

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে জ্বালানি পরিবহন সহজ করতে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (Single Point Mooring)- SPM প্রকল্পের পরিচালক (Operator) নিয়োগ চুক্তি করা হয়। এই SPM পাকিস্তান আমল থেকে বড় কাঙ্ক্ষিত প্রকল্প, যা পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে মিলে ৬৫ বছরের শেখ হাসিনার আগে কেউ উদ্যোগ নেয় নাই। কিন্তু শেখ হাসিনা প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প নির্মাণ সম্পূর্ণ করেন। প্রকল্পটি হল, যেহেতু কর্ণফুলী নদী দিয়ে ১৫/২০ হাজার টনের বেশি ক্ষমতার জাহাজ আসতে পারে না। তাই ১/২ লক্ষ টনের জাহাজে আনিত তেল সমুদ্রের মুখ্য থেকে ছোট ছোট লাইটারে করে Eastern Refinery-এ আনতে হয়, যাতে অনেক খরচ এবং ১৫/২০ দিন সময় লাগে। যাতে লাইটারেজ ভাড়া, Master Vessel Holding Charge, তেল অপচয়, এতে প্রতি মাসে প্রায় ২৫/৩০ কোটি টাকা খরচ হয়। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য বহির্নোঙর থেকে সমুদ্রের তলদেশে পাইপলাইন স্থাপন ও মহেশখালি স্থলভাগে প্রায় ৩ লক্ষ টন ধারণক্ষমতার ট্যাংক ও টার্মিনাল প্রতিষ্ঠা করে। ঐ পাইপলাইন দিয়ে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল ২/৩ দিনের মধ্যে Eastern Refinery ও নতুন স্থাপিত ট্যাংকে খালাস করা সম্ভব। ইহা চালু হলে মানুষ কমমূল্যে জ্বালানি তেল পাবে। অন্যদিকে, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পরিবহনের খরচের কারণে জ্বালানি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কারণ দেশের পূর্ব ও দক্ষিণ অঞ্চল থেকে শত শত কিঃমিঃ দূরে জ্বালানি পৌঁছানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। শত শত বছর ধরে অবহেলিত উত্তর অঞ্চলে মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির জন্য কম খরচে জ্বালানি প্রয়োজন। তাই ভারত থেকে পাইপলাইন স্থাপন করে এর মাধ্যমে তরল জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করেন। একইভাবে ঐ অঞ্চলের মানুষের উন্নয়নের জন্য ভারত ও নেপাল থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে প্রায় ২,৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা করা হয়। যার প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রায় ১১.৭২ টাকা এবং আমাদের নিজেদের দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রায় ১১.৮৫ টাকা। উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের স্থায়ী বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ ও শিল্পায়নের জন্য পাবনায় রূপপুরে ২,৪০০ মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ভবিষ্যতে সেখানে আরও দুটি নিউক্লিয়ার বিদ্যুতের ইউনিট স্থাপন করার জন্য স্থান ও অনেক অবকাঠামো ঠিক করেছেন। তাই পরবর্তী ইউনিটগুলির খরচ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে। ইহা জাতির জন্য একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। দেশের সব শ্রেণির মানুষকে উন্নয়নের সাথে সংযুক্ত করা ও সবার জীবনমান উন্নত করা না গেলে দেশকে দ্রুত উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর করা সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ডাঃ ইউনূস ক্ষমতা নেওয়ার পর কিছু না বুঝে জ্বালানি সরবরাহের কথা চিন্তা না করে ঐ ২টি FSRU-এর চুক্তি বাতিল করে দেন। একইভাবে বাতিল করে দৈনিক ১০-০০ MMCFD ক্ষমতার Land-Based (স্থলভিত্তিক) এলএনজি টার্মিনাল ও রিজার্ভার স্থাপনের চুক্তি, যা শেখ হাসিনার সরকার, জাপানি ও বাংলাদেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ উদ্যোগে ২০২৪ সনে নভেম্বর-ডিসেম্বরে তৈরির কাজ আরম্ভ করার কথা ছিল। যদি এগুলো বাতিল না করত, তাহলে এখন গ্যাস/বিদ্যুতের এই সমস্যা হত না। এখন শুনছি ২ গুণ দামে একই গ্যাস ক্রয় করছে। ডাঃ ইউনূস টার্মিনাল (SPM) পরিচালনার জন্য যে বিদেশী ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা বাতিল করে দেন। এখন প্রায় ২ বছরেরও বেশি সময় ইহা অকার্যকরভাবে পড়ে আছে, দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুনছি এখন ২ গুণ দাম দেওয়ার প্রস্তাব করলেও কোনো বিদেশী প্রতিষ্ঠান আবেদন করেনি। ডাঃ ইউনূস এবং তারেক সাহেবের অদূরদর্শিতা, অপরিপক্ব ও সময় অনুপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে দেশ এখন মারাত্মক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। বর্তমান সরকার এখন বিদ্যুতের মারাত্মক সমস্যা সমাধানের স্থায়ী সমাধানের জন্য সোলার (সৌর) ও উইন্ড (বায়ু) বিদ্যুৎ দিয়ে সমাধান করার কথা বলেছে। ইহা শিশুকে "রাজা বানানোর" গল্প শোনানোর মত। সৌর বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- যখন সূর্যের আলো থাকে না, তখন মানুষ বিদ্যুৎ কোথায় পাবেন? জাপানের মতো দেশ, যাদের উন্নত প্রযুক্তি ও অর্থের অভাব নাই, তারাও তাদের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ১১ শতাংশ বিদ্যুৎ বিকল্প সৌর ও উইন্ড বিদ্যুতের উপর নির্ভর করে। এই জন্য পৃথিবীতে বেশিরভাগ দেশে অতিরিক্ত বা বিকল্প হিসাবে সৌর বিদ্যুতের উপর নির্ভর করে। গত শেখ হাসিনার সরকারও ১০ শতাংশ সৌর ও উইন্ড (বাতাস) বিদ্যুতের লক্ষ্যে ২৯টি প্রকল্পের জন্য বিদেশি কোম্পানিকে অনুমোদন ও জমি বরাদ্দ এবং কার্যাদেশ দেয়। যা ডাঃ ইউনূস বাতিল করে দেন। অতীতের এবং অন্যের উপর দোষ চাপানোর এই সংস্কৃতি যাদের, তারা ধ্বংসের জন্য উপযুক্ত, সৃষ্টির জন্য নয়? যেমন অতীত সরকার নতুন কোনো গ্যাসকূপ খনন করেনি। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং মানুষকে ভুল ধারণা দেওয়ার জন্য এই বক্তব্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেওয়া হয়। বাস্তবতা হলো, ব্যাপক অনুসন্ধান হয়েছে। গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা না জেনে কূপ খনন করা অর্থের অপচয়। কারণ প্রতিটি কূপ খনন করতে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। তাই প্রথমে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা যাচাই করার জন্য সিসমিক সার্ভে (Seismic Survey) সহ বিভিন্ন প্রারম্ভিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হয়েই গ্যাস উত্তোলনের জন্য ড্রিল (Drill) করা হয়। তার পরেও সবসময় আশাব্যঞ্জক গ্যাস পাওয়া যায় না। তাই আর্থিক ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে খুব পরিকল্পিতভাবে অনুসন্ধান কাজে এগাতে হয়। যদি আওয়ামী লীগ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন না করত, তা হলে ১১০০ MMCFD থেকে ইহা ২৬০০ MMCFD উন্নীত হল কীভাবে? পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে অনুসন্ধানের পরিকল্পনা ছিল। ঐ অঞ্চলে আগে কখন গ্যাস প্রাপ্তির কোনো ঐতিহাসিক তথ্য ছিল না। সব অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু দেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলেই গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা উজ্জ্বল। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয় পরিষ্কার হওয়া উচিত। সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ ভারত বিভাগ থেকে পর থেকেই বিদ্যমান। দেশ বিভক্তির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত Mr. Redcliff স্থল সীমানা ৯৫% শেষ করে সমুদ্রসীমাতে হাত না দিয়ে চলে যায়। তারপর পাকিস্তানের ২৫ বছর এবং বাংলাদেশের (শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত) প্রায় ৪০ বছর, সর্বমোট ৬৫ বছর কোনো সরকার ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কোনো উদ্যোগ নেয় নাই। শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ১৯৯৬ সন থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার জন্য নৌবাহিনীকে দায়িত্ব দেন। নৌবাহিনীর প্রয়োজনে সে সময় দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কয়েকটি frigate কিনে দেন এবং তারা অনেক তথ্য সংগ্রহ করে। কিন্তু ২০০১ সনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পর ঐ কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৯ সনে ক্ষমতা গ্রহণের পর পুনরায় পূর্ণ উদ্যমে অগ্রাধিকার দিয়ে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির জন্য অনেক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর হ্যাগ (Hague), নেদারল্যান্ডে আন্তর্জাতিক আদালতে ভারত ও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ২টি পৃথক সমুদ্রসীমা সমাধানের জন্য মামলা করেন। পরবর্তীতে বহুবার আদালতে শুনানির ও বহু কূটনৈতিক দেন-দরবারের পর বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছ থেকে প্রায় ১,১১,৫৮৮ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা এবং ভারতের সাথে বাংলাদেশের বিরোধপূর্ণ ২৫,০০০ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার মধ্যে বাংলাদেশ পায় প্রায় ১৯,৪০০ বর্গকিলোমিটার এবং ভারত পেয়েছে ৫,৬০০ বর্গকিলোমিটার। শেখ হাসিনার দূরদর্শী কূটনীতির প্রজ্ঞার কারণে উভয় দেশ এই রায় মেনে নেয়। প্রশ্ন আসে, ১৯৮২ সালে প্রথম জাতিসংঘের অধীনে সমুদ্রসীমা আইন (UNCLOS)-এ আইন গৃহীত হয়েছিল। এরপর জাতীয় পার্টি ৯ বছর ও বিএনপি ১০ বছর ক্ষমতায় ছিল, কিন্তু তারা এ বিষয়ে কেন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি? বর্তমান সরকারের নিকট প্রশ্ন— অতীতে (১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে) এই দীর্ঘ ১০ বছর সময় ক্ষমতায় থেকে বিদ্যুৎ জ্বালানির জন্য আপনারা কী কী করেছেন, সুনির্দিষ্ট করে বলবেন কি? দেশবাসীর জানা মতে, শেখ হাসিনার (১৯৯৬-২০০০) সময় ক্ষমতায় থাকাকালীন সময় আরম্ভ হওয়া টঙ্গী, আশুলিয়া, ভৈরবে ঐ ছোট ৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করা ছাড়া আর কিছুই কি করা হয়েছে? এখন ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানির কিছু সমস্যা হলেও ভারত, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর বা চীনসহ কোথাও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ কোনো সমস্যা নেই। বাংলাদেশের মতো কোথাও বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং শিল্পকারখানা বন্ধের কোনো নজির নাই। দুর্ভাগ্যবশত, ডাঃ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ঐ ২টি FSRU-এর কার্যাদেশ বাতিলের কারণে মূলত এই সমস্যা দেখা দেয়। এখন বহু বেশি দামে নতুন FSRU সংযুক্ত করতে কমপক্ষে আরও ২ বছর সময় লাগবে। প্রতিদিন গ্যাসের অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে দেশের অর্থনীতি ভয়ঙ্কর নিম্নমুখী হচ্ছে এবং মানুষ কর্মসংস্থান হারাচ্ছে। অথচ আওয়ামী লীগ সরকার দেশে প্রায় ৩০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করে ও জ্বালানির ব্যবস্থা করে গেছে। এরকম হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিয়ে ঐগুলি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারলে বিদ্যুৎ/গ্যাসের কোনো সমস্যা হত না। নিরপেক্ষভাবে বলতে গেলে, বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনায় দূরদর্শিতার অভাবে এই মারাত্মক বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের উদ্ভব হয়েছে। ইহা শুধু এই খাতে নয়, অন্য সকল খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। বিদ্যুৎ জ্বালানি না থাকলে বুঝা যায়। আর অন্য খাতের ধ্বংসের অবস্থা চোখে পড়ে না। তাই বলব, স্বাধীনভাবে পত্রিকাকে লিখতে দিন, টেলিভিশনে কথা বলতে দিন। ওখান থেকে দেশের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারবেন। অনেক পরামর্শ পাবেন, যা আপনার দেশ পরিচালনায় ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করবে। বিচার বিভাগকে দলীয় অফিসের মত ব্যবহার আর পুলিশ/প্রশাসনকে দলীয় কর্মীর মত ব্যবহার দেশ এবং আপনাদের ধ্বংস ডেকে আনবে। সকল সমস্যা সমাধানের জন্য সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা অপরিহার্য। দয়া করে শাসনব্যবস্থায় নজর দিন। এভাবে চললে এই সুন্দর দেশটি অনিবার্যভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে।

লেখক: অশ্রু হাসি, রাজনীতিবিদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক