বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের ধাক্কা: রূপপুর নিয়ে ঢাকার সুর বদল, ভিয়েনায় রোসাটমের সঙ্গে জরুরি বৈঠক

লিখেছেন: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম
তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের ধাক্কা: রূপপুর নিয়ে ঢাকার সুর বদল, ভিয়েনায় রোসাটমের সঙ্গে জরুরি বৈঠক

সারাদেশে আকস্মিক লোডশেডিং এবং তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের জাঁতাকলে পড়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎপ্রকল্প নিয়ে ঢাকায় বইছে আলোচনার নতুন হাওয়া। নিরাপত্তাজনিত ও প্রযুক্তিগত অজুহাতে এতদিন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার সময়সীমা ধীরগতিতে এগোলেও, বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতি ঢাকার নীতি-নির্ধারকদের যেন ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে। দেশজুড়ে যখন বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন অচল হয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) সম্মেলনের ফাঁকে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক সংস্থা ‘রোসাটম’-এর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক জরুরি ও আকস্মিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রোজিনা ইসলাম। বৈঠকে ঢাকার পক্ষ থেকে রূপপুর প্রকল্পের কাজ দ্রুততম সময়ে শেষ করে উৎপাদনে যাওয়ার জন্য জোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই তড়িঘড়ি বৈঠকের পেছনে রয়েছে এক গভীর সমীকরণ। প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সিংহভাগ অর্থায়নই এসেছে রাশিয়ান ঋণ সহায়তা থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং মুদ্রা নিষ্পত্তির জটিলতার কারণে প্রকল্পের কিস্তি ও অর্থ পরিশোধ নিয়ে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত এবং নিরাপত্তাজনিত মূল্যায়নের কথা বলে প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদনের নির্ধারিত দিনক্ষণ বারবার পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। ফলস্বরূপ, প্রায় কাজ সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও দেশের জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছিল চরম অনিশ্চয়তা।

তবে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সংকটের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ার পর ঢাকার অবস্থানের এই হঠাৎ পরিবর্তন স্পষ্ট রূপ নিয়েছে। অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ওপর চাপ কমানোর জন্য রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ ছাড়া এখন অন্য কোনো দ্রুত সমাধান ঢাকার হাতে নেই। তাই জটিল মুদ্রা নিষ্পত্তি এবং নির্মাণের সময়সূচি সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলমান থাকা সত্ত্বেও, ঢাকা এখন প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা দূরে সরিয়ে রোসাটমকে দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদ দিচ্ছে।

ভিয়েনার এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, ঢাকার পররাষ্ট্র ও জ্বালানি নীতিতে আপাতত বাস্তবমুখী অবস্থান গ্রহণ ছাড়া উপায় নেই। রুশ ঋণে তৈরি এই মেগা প্রজেক্টের ভাগ্য কেবল অর্থনৈতিক দেনা-পাওনার ওপর নির্ভর করছে না, বরং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠিও এখন রোসাটমের সময়মতো রূপপুর হস্তান্তরের ওপর ঝুলছে। সংকট মোকাবেলায় রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ও সমন্বয় দ্রুততর করার এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত দেশের অন্ধকার ঘোচাতে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক