জিন্নাহর উত্তরাধিকার ও জামায়াতের রাজনীতি: আদর্শিক ধারাবাহিকতা নাকি সুবিধাবাদ?
মানুষের আচরণ ও মানসিকতার ওপর পারিবারিক ইতিহাস ও লালিত পরিবেশের প্রভাব সুদূরপ্রসারী — এ কথা সমাজবিজ্ঞান বহুদিন ধরেই বলে আসছে। রাজনৈতিক আদর্শ, কৌশল আর মূল্যবোধও অনেক সময় এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে, এক গোষ্ঠী থেকে আরেক গোষ্ঠীতে সঞ্চারিত হয় — রক্তের মাধ্যমে নয়, বরং চিন্তার ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক স্বার্থের মিল দিয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পাঁচ দশক পর আজ এই বিষয়টি যেন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ভাবাদর্শিক উত্তরসূরিদের সদম্ভ উপস্থিতি আজ দেশের নানা প্রান্তে লক্ষণীয়।
বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯৯ শতাংশই সুন্নি মতাবলম্বী। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলো নিজেদের সুন্নি ইসলামের একমাত্র "প্রকৃত প্রতিনিধি" দাবি করলেও, তাদের অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সুন্নি মূল্যবোধের মূল কাঠামোর সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। অতীতে জামায়াত ও তাদের সহযোগীরা আহমেদিয়া (কাদিয়ানী) এবং ইসমাইলিয়া (আগাখানি) সম্প্রদায়কে মুসলিম হিসেবে স্বীকার করেনি; বাহাই কিংবা মুনকার-ই-হাদিসপন্থীদের ইসলামের গণ্ডির বাইরে আখ্যা দিয়ে তাদের সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করার আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়েছে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে সেই জামায়াত ও তাদের সহযোগী শক্তিগুলোর রাজনৈতিক সুর ও অবস্থানে বিস্ময়কর পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে — নিজেদের সুনির্দিষ্ট স্বার্থকে সামনে রেখে এই নীতিগত রূপান্তর আজ বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বিশেষত ২০২৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শিক অনুসারীদের প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি স্থাপন কিংবা তাঁর জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী পালনের মতো ঘটনা তারই ইঙ্গিত দেয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জিন্নাহ নিজেও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে অবস্থান, মতাদর্শ ও কৌশল পাল্টাতে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাই তাঁর পারিবারিক ইতিহাস, ধর্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক চরিত্র বিশ্লেষণ করলে তাঁর এই আদর্শিক উত্তরসূরিদের আচরণগত মিল সহজেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর পৈতৃক নিবাস ছিল ভারতের অন্যতম ব্যবসাকেন্দ্র গুজরাটে। তাঁর বাবা জিন্নাহভাই পুঞ্জা (আনুমানিক ১৮৫০–১৯০২) ছিলেন একজন সফল ব্রিটিশ-ভারতীয় ব্যবসায়ী এবং 'জিন্নাহভাই অ্যান্ড কোং' ও 'গ্রাহামস শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানি'র প্রতিষ্ঠাতা। পুঞ্জা জন্মেছিলেন গুজরাটের গোন্ডাল রাজ্যের পানেলি মতি গ্রামের এক হিন্দু ক্ষত্রিয় রাজপুত পরিবারে; পরে ১৮৭৪ সালে ধাফা গ্রামের খোজা সম্প্রদায়ের (শিয়া মুসলিমদের একটি ধারা) মিঠাবাইকে বিয়ে করেন। ভারতীয় ইতিহাসবিদ ডি. এন. পাণিগ্রাহীর মতে, খোজা সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও পুঞ্জার পরিবারে হিন্দু রীতিনীতি ও সংস্কৃতির গভীর প্রভাব রয়ে গিয়েছিল।
এই পরিবারেই ১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর জন্ম নেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। করাচি ও লন্ডনে আইনবিদ্যা শেষ করে বোম্বেতে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। প্রথমে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পক্ষে কাজ করলেও, ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং ১৯৪০-এর দশকে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পৃথক রাষ্ট্র 'পাকিস্তান' গঠনের আন্দোলন জোরালো করেন। ১৯৪৭ সালে হন পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর-জেনারেল।
সুন্নি মুসলিম না হয়েও সুন্নি মুসলিম দেশ পাকিস্তানের জাতির পিতা জিন্নাহ ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও পশ্চিমা জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত এক মানুষ — বিয়েও করেছিলেন অন্য ধর্মের একজনকে। জন্মসূত্রে তিনি ছিলেন শিয়া ইসলামের নিজারি ইসমাইলি শাখার অনুসারী, যারা নিয়মিত নামাজ-রোজা-হজের বদলে জীবিত ইমাম আগা খানের আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়; পরে তিনি শিয়াদের প্রধান শাখা 'ইসনা আশারিয়া' মতবাদ গ্রহণ করেন। ১৯২০-এর দশকে 'খেলাফত আন্দোলন'-এর তিনি ছিলেন তীব্র বিরোধী। এমনকি ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট পাকিস্তানের গণপরিষদে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মের কোনো স্থান থাকবে না এবং সকল ধর্মের নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে। তবু রাজনীতির শেষ মুহূর্তে "ইসলাম বিপন্ন" স্লোগান ব্যবহার করে জনসমর্থন আদায় করেছিলেন তিনি। তৎকালীন সময়ে আবুল আলা মওদুদী ও জামায়াতে ইসলামী জিন্নাহর এই রাষ্ট্রচিন্তাকে "ইসলামী শাসন নয়, বরং মুসলিমদের ক্ষমতার রাজনীতি" আখ্যা দিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছিল।
রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের অস্তিত্ব ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন সময়ে জাসদ, কমিউনিস্ট পার্টি, বিএনপি এমনকি আওয়ামী লীগের ভেতরেও নিজেদের নেতাকর্মীদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কাদিয়ানী ও শিয়াদের অমুসলিম আখ্যা দেওয়া একটি দল আজ নিজেদের রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে সেই জিন্নাহকেই, যাঁর ব্যক্তিগত জীবনচর্চা ও ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান ছিল তাদেরই ঘোষিত ইসলামি নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।
একদিকে ধর্মীয় গোঁড়ামির রাজনীতি, অন্যদিকে ব্যক্তিগত ও দলগত স্বার্থে নীতি-আদর্শের বারবার পরিবর্তন — জামায়াত ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে যে ধারাবাহিক সুবিধাবাদ লক্ষ্য করা যায়, তা কি নিছকই এক ঐতিহাসিক ও নৈতিক স্খলন, নাকি তাদের রাজনৈতিক চরিত্রেই এই দ্বিচারিতা গেঁথে আছে? প্রশ্নটি আজ সচেতন দেশবাসীর সামনে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নীহারিকা রায়,উন্নয়নকর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
সম্পর্কিত সংবাদ
তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের ধাক্কা: রূপপুর নিয়ে ঢাকার সুর বদল, ভিয়েনায় রোসাটমের সঙ্গে জরুরি বৈঠক
মহাকাশ থেকে ছায়াযুদ্ধ: মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলার নেপথ্যে কি তবে চিনা কৃত্রিম উপগ্রহ? মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে মহাকাশ গোয়েন্দাগিরির নতুন সমীকরণ
বাংলাদেশ কি চরম সংকটের দ্বারপ্রান্তে? — প্রবৃদ্ধি, শাসনব্যবস্থা ও টিকে থাকা