শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

প্রতিবেশী

আরশোলা আন্দোলনে ওয়াংচু-পাপ্পুদের মাছশিকারের মতলব, মুখ খুললেন নরেন্দ্র মোদী ।

লিখেছেন: অমিত গোস্বামী প্রকাশিত: ২২ জুলাই ২০২৬, ৩:১৯ পিএম
আরশোলা আন্দোলনে ওয়াংচু-পাপ্পুদের মাছশিকারের মতলব, মুখ খুললেন নরেন্দ্র মোদী ।

নিট-কাণ্ড নিয়ে অবশেষে মুখ খুললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বললেন, “প্রশ্নফাঁস মহাপাপ। তা রোখা গোটা দেশের দায়িত্ব। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দোষীদের সর্বোচ্চ কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সব পক্ষকে একযোগে এমন একটি ত্রুটিমুক্ত ও নির্ভুল পরীক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে ভবিষ্যতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনও সুযোগ না থাকে।“ ওদিকে ক্ষমতাচ্যুত ও সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়া দল তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন যে তিনি প্রয়োজনে ককরোচ পার্টির হয়ে আন্দোলনে সামিল হবেন। এই ঘোলা জলে মাছ ধরতে অনেক বিরোধী নেতা-নেত্রী নেমেছেন। তাদের সাবধান করে মোদী বলেছেন, "শিশুদের উস্কানি দেবেন না, ওদের সঠিক পথ দেখান।" ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। যে কোন দলের শাসনে হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা এখন ব্যবসা। সংবাদ মাধ্যমও অনেক শক্তিশালী। কাজেই এর অভিঘাত এখন বেশি। গত ১০ বছরে বিজেপি ক্ষমতায় থাকাকালীন ১৫২ টি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছে যা এই আমলে বিপর্যয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

পদত্যাগ কি সমস্যা সমাধানের রাস্তা?

ভারতে একটা কমন প্র্যাকটিস আছে তা হল কোন অঘটন ঘটলে মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবী ও পদত্যাগ। মন্ত্রীর পদত্যাগে কি দায়মুক্ত হওয়া যায়? পুরোন উদাহরণ বাদ দিলাম, ২০১৭ সালে বিজেপি’র রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু এক দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে পদত্যাগ করেছিলেন। এবারে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবী করার আগে এটা কি বিরোধীরা দেখবেন না যে দ্রুত নিট-এর প্রথম পরীক্ষা বাতিল করে দ্বিতীয় পরীক্ষা গ্রহণ করে ফলপ্রকাশ করে ছাত্রছাত্রীদের ভর্তির যথাযথ ব্যবস্থা করেছেন? এর পদচ্যুতি দাবী করে ভবিষ্যতে লাভ কী হবে? কেন্দ্রীয় সরকার মেনে নিয়েছেন যে সংসদের বাদল অধিবেশনে এই নিয়ে আলোচনা হবে এবং এই প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে সর্বদলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। তারপরেও আন্দোলনের প্রসঙ্গ অবশ্যই অন্য ইঙ্গিত দেয়। বিজেপি সমর্থক মিডিয়া একে ‘ডিপ স্টেট’ চক্রান্ত বলে অভিহিত করছে। আদৌ ব্যাপারটা কি তাই?

ডিপ স্টেট চক্রান্ত এটা নয়

'ডিপ স্টেট' বা 'নেপথ্য রাষ্ট্র' হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনীতির এমন একটি ধারণা, যেখানে মনে করা হয় যে একটি দেশের নির্বাচিত সরকারের আড়ালে একটি অনির্বাচিত, গোপন ও শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা পেছন থেকে রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। এই গোষ্ঠীর মধ্যে সাধারণত দেশের উচ্চপদস্থ আমলা, গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্তা, সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী শিল্পপতিরা থাকতে পারেন। এরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের স্বার্থে, মতাদর্শে বা পরিকল্পনামাফিক সরকারি নীতি নির্ধারণ বা পরিবর্তন করে। সহজ কথায়, এরা হলো "সরকারের ভেতরের আরেক সরকার"। ): 'ডিপ স্টেট' (তুর্কি ভাষায় derin devlet) শব্দটি প্রথম তুরস্কেই জনপ্রিয় হয়। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে তুরস্কের সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং কট্টর জাতীয়তাবাদীদের একটি অংশ মিলে একটি গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থা (ISI)-কে প্রায়ই একটি অত্যন্ত শক্তিশালী 'ডিপ স্টেট' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। মিশরে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা এতটাই বেশি যে তারা শুধু রাজনীতি নয়, দেশের অর্থনীতির একটা বিশাল অংশও সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে।

বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল ডিপ স্টেট চক্রান্তের শিকার

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন, শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের 'অ্যারাগালয়া' আন্দোলন কিংবা নেপালের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দুভাবে দেখেন। তীব্র জনক্ষোভ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এবং ডিপ স্টেট কনসপিরেসি। এখানকার ঘটনাগুলির মূল কারণ (Primary Driver) ডিপ স্টেটের ভূমিকা (Deep State Factor)। বাংলাদেশে (২০২৪) ছাত্র-জনতার ক্ষোভের মুখে সামরিক বাহিনী শেষ মুহূর্তে শাসকের পরিবর্তে জনতার পক্ষে অবস্থান নেয়। শ্রীলঙ্কা (২০২২)রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও দৈনন্দিন জীবনের সংকট রাজাপক্ষে পরিবারকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা হাত গুটিয়ে নেয়। নেপালঘন ঘন সরকারবদল ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরম ব্যর্থতা আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর (ভারত-চীন) কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব সামলাতে ব্যর্থ হয়।

ভারতে ডিপ স্টেট চক্রান্ত কেন ব্যর্থ?

পাকিস্তান, তুরস্ক বা মিশরের মতো ভারতে কোনো 'ধ্রুপদী' বা 'ক্লাসিক' ডিপ স্টেটের অস্তিত্ব নেই। অর্থাৎ, ভারতের সামরিক বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কখনোই নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে সরাসরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেয়নি; সেনাবাহিনী এখানে কঠোরভাবে অসামরিক বা নির্বাচিত সরকারের (Civilian Government) অধীনে কাজ করে। ভারতে নেপথ্য ক্ষমতার এই কেন্দ্রগুলোকে মূলত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়: ১) আমলাতন্ত্র ২) আদর্শগত বা সাংস্কৃতিক মতাদর্শ ৩) কর্পোরেট-রাজনৈতিক আঁতাত ৪) তদন্ত ও গোয়েন্দা সংস্থা। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন ও আইনি শাসন ভারতে প্রতিষ্ঠিত। যখন রাষ্ট্রের কর্মচারীরা নিজেদের মালিক ভাবতে শুরু করে এবং জনগণের অধিকার হরণ করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, তখন তাকে দেশদ্রোহী কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য করা যায়। যা ভারতে নেই। একটি সচেতন নাগরিক সমাজ এবং স্বাধীন বিচার বিভাগই পারে এই অদৃশ্য শক্তির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে। ভারতে তা পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান।

মোদীর সৌজন্য বিরোধীদের বোঝা প্রয়োজন

ভারতে যেটা হচ্ছে সেটা আগমার্কা আন্দোলন যা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার মতলব। আজ হাসপাতালে এখনও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন সোনম ওয়াংচুক। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) দাবি এখন একটাই— কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা! এদের সঙ্গে জূটেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবিও জানান তিনি। নিউ ইয়র্ক, সান হোসে, লন্ডন এবং ডাবলিনেও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন ওই গ্রুপের সদস্যেরা। ভারতের মোদী সরকার এখনও সংযত হয়ে এই আন্দোলনের মোকাবিলা করছেন। দলীয় কর্মীদের রাস্তায় নামতে নিষেধ করা হয়েছে। এর কারণ দিল্লির যন্তরমন্তর রোড ছাড়া আর কোথাও আন্দোলন ছড়ায় নি। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী যদি শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিক মোকাবিলাকে বিজেপি’র দুর্বলতা ভাবেন, ভুল করবেন। এই সামান্য আন্দোলন সামলানোর ক্ষমতা মোদীর আছে। কিন্তু সেই সৌজন্য বোঝার ক্ষমতা রাহুলের আছে কি?

লোখক: অমিত গোস্বামী, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক, কোলকাতা