বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

প্রতিবেশী

তসলিমার কলকাতায় পদার্পণ ও জয় অশান্তিঃ

লিখেছেন: অমিত গোস্বামী প্রকাশিত: ৩ আগস্ট ২০২৬, ৭:০২ পিএম
তসলিমার কলকাতায় পদার্পণ ও জয় অশান্তিঃ

তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় পুনরাগমনের অনুষ্ঠানে জয় গোস্বামীকে ‘শুনব না’ ধ্বনি দেওয়ায় তিনি মঞ্চ থেকে নিজ আসনে ফেরা নিয়ে কবিতার সাথে সামান্য সংপৃক্ত লোকজনের অর্ধেক ‘ক্যা ক্যা ছি ছি’ বলছেন, বাকি অর্ধেক চুপ, কিন্তু মনে মনে বলছেন, দ্যাখ, কেমন লাগে! ঘটনাটি নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক, কিন্তু অস্বাভাবিক নয়। দায়ী যদি কাউকে করতে হয় তাহলে আয়োজকদের দায়ী করাই সমীচীন। পাবলিক মুড তারা অনুধাবন না করার দায় নিতে হবে তাদের। জয় গোস্বামীর মত জনস্বীকৃত কবিকে যদি মঞ্চ দিতে আয়োজকরা অক্ষম হন, তাহলে তাকে দর্শক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর অর্থ নেই। দর্শক হিসেবে তার উপস্থিতি যদিওবা উপস্থিত জনতা মেনে নিয়েছিলেন, তাকে ডেকে ‘কিছু বলুন’ বলায় গোলমাল বাধল।

তসলিমার নির্বাসনের সাতকাহণঃ

তসলিমা নাসরিন ১৯৯৪ সালের ৯ অগাস্ট নিজের দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হন মৌলবাদীদের রোষে। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রেক্ষিতে যে হিন্দু নির্যাতন বাংলাদেশে হয়েছিল তার প্রেক্ষিতে ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘লজ্জা’ বাংলাদেশের মৌলবাদীদের ভয়ংকর ক্ষুব্ধ করেছিল। কিন্তু তার আগে? তার আগে তার নির্বাচিত কলাম-এ তার খুল্লামখুল্লা লেখা যেখানে নিজের বাবাকেও ছাড়েন নি তা নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়েছিল বাংলাদেশে। তারপরে ১৯৯৪ সালের মে’ মাসে ভারতের ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে তিনি বললেন কোরান সংশোধনের কথা। আগুন জ্বলল সেখানেই। তিনি প্রথমে গেলেন সুইডেন। থাকলেন, নাগরিকত্ব নিলেন, কিছুদিন আমেরিকা, বছর দুয়েক জার্মানিতে থেকে আরেকবার ৯৭-৯৮ সালে ঢুকলেন বাংলাদেশে। কিন্তু জনবিক্ষোভে ফের নির্বাসন। এবার ইওরোপে।

সাড়ে তিন বছরের কলকাতাবাসঃ

২০০৪ সালে তিনি এলেন কলকাতায় থাকতে। ৭ নং রডন স্ট্রিটে বাস। লিখছেন। বড় পত্রিকা গোষ্ঠীর হাত মাথার ওপরে। ঘুরছেন, বেড়াচ্ছেন, ভালই ছিলেন। তবে ২০০৩ সালে তার আত্মজীবনীমূলক বই ‘দ্বিখন্ডিত’ প্রকাশিত হওয়ার পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছিল। সেখানে মুসলিম মৌলবাদকে আক্রমণ করার সাথে তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ শামসুল হক ও মাসুদ ভাট্টিকে যৌনমতলবী বলে আক্রমণ করে বিতর্কের ঢেউ তোলেন। ২০০৫ সালে জনৈক সুজিত কুমার সিনহা’র আবেদনক্রমে দ্বিখন্ডিত’র ওপরে আদালতের নির্দেশে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। বিতর্কের কারণে বিখ্যাত হওয়া তসলিমার বইয়ের কাটতি তখন তুমুল। এবার আসে ২০০৭ সাল। বিখ্যাত নন্দীগ্রাম আন্দোলন নিয়ে বাম সরকারের লাটপাট অবস্থা।

বুদ্ধদেবের ভয়ে কেঁপে ওঠাঃ

সেই সময় জনৈক কংগ্রেসি হাফ নেতা যে পরে তৃণমূল কংগ্রেসে এসে ফুল নেতা হয়ে উঠেছিলেন সেই ইদ্রিস আলি প্রতিষ্ঠা করলেন অল ইন্ডিয়া মাইনরিটি ফোরাম। তারা বাম সরকারকে বিব্রত করতে খুব হঠাৎ ‘তসলিমা হঠাও’ আন্দোলনের ডাক দিলেন। সেই ডাককে সমর্থণ দিলেন ফুরফুরার পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকী। বাম সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সংখ্যালঘু ভোট হারানোর ভয়ে কেঁপে গেলেন। লেখক-বুদ্ধিজীবিরা বেশীর ভাগই বাম শিবিরে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পর্কে অভিযোগের প্রেক্ষিতে তসলিমা বিরোধী। কাজেই ২০০৭ সালের ২১ নভেম্বর প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তসলিমাকে পাঠানো হল দিল্লি। কেন্দ্রে তখন বাম সমর্থিত ইউপিএ সরকার।

ইউপিএ সরকারের বিমাতৃসুলভ আচরণঃ

ইউপিএ সরকার তসলিমাকে ঠেলে দিল রাজস্থানে। কিছুদিন থাকার পরে তসলিমার জেদের কারণে তাকে আনা হল দিল্লিতে। সেখানে গৃহবন্দী রাখা হল ৭/৮ মাস। পরোক্ষ চাপ দেওয়া হল ভারত ছাড়ার। কিন্তু তার জাতিসংঘের পাসপোর্ট থাকায় জোর করে সরানো সম্ভব ছিল না। এবারে রেসিডেন্ট পারমিটের নবায়নে সমানে টালবাহানা চলল। কিন্তু চাপ কমল যখন ২০০৯ এর নির্বাচনের পরে। ইতিমধ্যে ঘটেছিল আরেক কান্ড। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে, যখন নরেন্দ্র মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী সে’সময় গুজরাটের ভাবনগরের বোতাদ শহরে এক রাজনৈতিক জনসভায় বলেছিলেন - '"তসলিমা মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে সত্য বলতে সাহস দেখিয়েছেন। কেন্দ্র সরকার যদি তাঁকে দেখে রাখতে না পারে, তবে তাঁকে গুজরাটে পাঠিয়ে দিন। গুজরাটের মানুষ এবং সরকার তাঁর দেখাশোনা করবে। তাঁকে সুরক্ষা দেওয়ার সাহস আমার আছে।"

বিজেপি সরকারের তসলিমা উদ্যোগঃ

২০১৪ সালে ভারতে ক্ষমতায় আসে বিজেপি সরকার। তারা তসলিমার বিষয়ে যে সিদ্ধান্তগুলি নিয়েছিল তা হল – দীর্ঘ মেয়াদী রেসিডেন্স পারমিট, স্থায়ী নিবাসের নিশ্চয়তা, ২৪ ঘন্টার সশস্ত্র নিরাপত্তা, কোথাও যেতে নিরাপদ গাড়ির ব্যবস্থা ও অবস্থানের গোপনীয়তা। ফলে ২০১৪ সাল থেকে তসলিমা নাসরিন ভারতে অতিথি হিসেবে নিরাপদেই আছেন। মাঝেমধ্যে সোশাল মিডিয়ায় নাগরিকত্ব নেওয়ার কথা বলেন বটে, কিন্তু আবেদন করেন নি। না করাই ভালো। ভারতীয় নাগরিকত্ব নিলে এখনকার সুবিধাগুলি পাবেন না।

জয় গোস্বামীর চাটুকারিতাঃ

এবার আসি জয় গোস্বামী’র প্রসঙ্গে। তিনি অনন্য কবি হলেও মানুষ হিসেবে বিতর্কিত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে তাঁর জীবদ্দশায় যে তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছিল আমি নিজেও তার সাক্ষী। জনশ্রুতি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ কবি পিনাকী ঠাকুরের বাংলা সাহিত্যের বর পত্রিকা থেকে বিদায় এই তিক্ততার ফল। আরো অনেক আর্থিক বিষয় নিয়ে গোলমাল শোনা যায়। ক্রমে জয় গোস্বামীকে বিদায় নিতে হয় সেই বড় পত্রিকা গোষ্ঠী থেকে। যোগ দেন আরেক পত্রিকায়। সেখানেও টিঁকতে পারেন নি। এবার আশ্রয় শাসকনেত্রীর বদান্যতার আঁচলে। নজরুল অ্যাকাডেমির প্রধান হলেন। সেখানে কাজী নজরুল বিষয়ক কোন মহান কাজ চোখে না পড়লেও তিনি যে আর্থিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধা পেয়েছেন তা নিজমুখে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে নির্লজভাবে প্রকাশ করেছেন যা কবির কাছে প্রত্যাশিত নয়। ফলে তার প্রতি জনরোষ ধীরে ধীরে ধূমায়িত হয়েছে।

শাসনবদল হতেই সংস্কৃতি জগতে বিস্ফোরণঃ

প্রথমেই বলেছি যে তিনি অনন্য কবি হলেও মানুষ হিসেবে বিতর্কিত। তার সাথে আরেক নামী শাসক গোষ্ঠীর কবি যে কবিতা অ্যাকাডেমির প্রধান হন, তার সাথে বাক্যালাপ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অন্যান্য কবিরাও এড়িয়ে চলতেন। এই অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতা পালটে গেল এবং এল বিজেপি। কবি-লেখকদের মধ্যে আমার মত দু-এক পিস অর্বাচীন ছাড়া বিজেপি পক্ষের কেউই ছিল না। কিন্তু এরপরে সংস্কৃতি জগতে যা ঘটল তাকে ‘বাহবা সময় তোর সার্কাসের খেলা’ বলা যায়। প্রচুর মানুষ দাবী করতে শুরু করলেন যে তারা গত ১৫ বছরে সুযোগ পাননি, বঞ্চিত হয়েছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে। কথাটা আংশিক অবশ্যই সত্যি।

জয়কে মঞ্চে ডাকতেই তুমুল হট্টগোলঃ

প্রচারের আলো পাওয়ার প্রতিযোগিতায় একটি সংস্থা তসলিমা নাসরিনকে কলকাতায় আসার উদ্যোগ নিতেই উদ্বেলিত হল পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি। যদিও তার আগে কলকাতার সংস্থা যুগসাগ্নিক ২০২৫ সালে তসলিমাকে নিয়ে দিল্লিতে অমুষ্ঠান করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর সবুজ সিগনাল পেতেই এই উদ্যোগ রূপ নিল বাস্তবে। মুখ্যমন্ত্রী থাকলেন। কিন্তু উপস্থিত ও আমন্ত্রিত কবি জয় গোস্বামীকে মঞ্চে ডাকতেই তুমুল হট্টগোল। জনগণের চাপে মঞ্চ থেকে নেমে গেলেন জয় গোস্বামী। তসলিমা তার কথা শুরু করলেন।

দায়ী মানুষ নয়, তবে ঘটনা দুর্ভাগ্যজনকঃ

এবারে প্রশ্ন এ’ভাবে প্রথিতযশা কবি জয় গোস্বামীর অবমাননা কি ঠিক কাজ হল? আড়াআড়ি বিভক্ত বাঙালি। এই ঘটনাকে খুব সোজা দৃষ্টিতে দেখলে হবে না। জয় গোস্বামীকে মঞ্চ থেকে নামানোর কোন সরকারি বা রাজনৈতিক আদেশ ছিল না। অনুষ্ঠানসূচী বা আমন্ত্রণপত্রে জয় গোস্বামীর নাম ছিল না। কাজেই যারা জয় গোস্বামীকে ‘শুনব না’ বলে চেঁচিয়েছেন, তাদের সেই না শোনার অধিকার অবশ্যই ছিল। এবারে আপনি আমায় নিমন্ত্রণ করেছেন, আমি এসেছি, আপনাকে না জানিয়ে নিমন্ত্রিত হিসেবে আরেকজনকে নিমন্ত্রণ জানিয়ে হাজির করতে পারি? আবেগাপ্লুত তসলিমা হয়ত সুনীল বিরোধিতার কারণে জয়কে পছন্দ করেন বলে ডেকেছিলেন। জয়কে আলাদা করে সম্মানিত করার অধিকার আয়োজকদের ছিল ও তা ঘোষণা করে। কিন্তু মঞ্চ দেওয়ার অধিকার তসলিমার ছিল কি? জয় গোস্বামীর গ্রহনযোগ্যতা যে তলানিতে সেটা আয়োজকরা জানতেন না? জয় হয়ত নিজের ভাবমুর্তির ছেঁড়াফাটা অবস্থা বোঝেন নি। তাই যা ঘটেছে সেটা ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলা ছাড়া আর কিছুই বলা ঠিক নয়। শুধু বলা ভালো যে এটা আয়োজকদের ব্যর্থতা এবং রাস্ট্রীয় প্রোটকলে থাকা কবি তসলিমারও জানা উচিৎ ছিল যে পূর্বনির্ধারিত ও পুলিশি অনুমতি নেওয়া অনুষ্ঠানসূচীতে স্বেচ্ছায় কাউকে গোঁজা ঠিক নয়।

অমিত গোস্বামী , সাংবাদিক ও সাহিত্যিক, কোলকাতা