মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

হোয়াইট হাউসের চিঠি ও ভূ-রাজনীতি: চটকদার সংবাদের পেছনের আসল সত্য, অটো- পেন প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের খেলা

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম
হোয়াইট হাউসের চিঠি ও ভূ-রাজনীতি: চটকদার সংবাদের পেছনের আসল সত্য, অটো- পেন প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের খেলা

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমে একটি সংবাদ ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ কূটনৈতিক খবর মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে গভীর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সমীকরণ ও কোটি কোটি টাকার খেলা। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরশাদ মাহমুদের একটি সাম্প্রতিক ফেসবুক স্ট্যাটাস এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মঞ্জুরে খোদা তারিকের পর্যালোচনার আলোকে বিষয়টির আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করা যাক। হোয়াইট হাউসের চিঠি ও প্রযুক্তির চটক হোয়াইট হাউস এবং মার্কিন শাসন ব্যবস্থার কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে যাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তারা জানেন যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রতিদিন হাজার হাজার চিঠি পান। হোয়াইট হাউসের ‘অফিস অব প্রেসিডেন্সিয়াল করেসপন্ডেন্স’-এ শত শত কর্মকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবী কাজ করেন। তারা চিঠিগুলো বাছাই করেন এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ দু-একটি ছাড়া কোনো চিঠিই সরাসরি প্রেসিডেন্টের টেবিলে যায় না। এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও সপ্তাহে মাত্র কয়েকটি চিঠির উত্তর নিজে দিতেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, চিঠিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে স্বাক্ষর দেখা যাচ্ছে, তা এলো কোথা থেকে? মার্কিন প্রশাসনে এটি মূলত ‘অটো-পেন’ (Auto-pen) প্রযুক্তির মাধ্যমে করা হয়। এই যন্ত্রের সাহায্যে প্রতিদিন শত শত চিঠিতে অবিকল এক সই বসিয়ে তা পাঠানো হয়। ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে বসে এই চিঠি লিখেছেন বা তারেক রহমানের মতো কাউকে চেনার কথা—এমনটি ভাবা মার্কিন প্রশাসনিক বাস্তবতার নিরিখে অমূলক।

চিঠির নেপথ্যে 'বোয়িং' বাণিজ্য ও কূটনীতি

এই চিঠি আদান-প্রদানের আসল রহস্য উদঘাটিত হয় ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট থেকে। মূলত মার্কিন বিমান প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘বোয়িং’ এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী চক্র এই প্রক্রিয়ার পেছনে সক্রিয়। কিছুদিন আগে বিশেষ দূত হিসেবে ঢাকায় এসে নতুন সরকারের কাছ থেকে বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি আদায় করা হয়েছিল। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ কর্তৃক বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে জানতে পেরে প্রেসিডেন্ট আনন্দিত। এটি স্পষ্ট করে যে, মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতেই এই কূটনৈতিক তৎপরতা। একই সাথে জাতিসংঘের অধিবেশনে সৌজন্য সাক্ষাতের ছবিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের যে সংস্কৃতি দেশে রয়েছে, তা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে।

চরম অর্থনৈতিক সংকট ও মেগা কেনাকাটা

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে এই মেগা কেনাকাটার সিদ্ধান্ত বড় ধরনের প্রশ্ন তোলে:

• বোয়িং চুক্তি: ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বিগত সরকারের সময়ের ২৫টি বোয়িং কেনার চুক্তি (৪৫,০০০ কোটি টাকা) এবং নতুন করে আরও ১৪টি বোয়িং কেনা (৩৫,০০০ কোটি টাকা)। • সামরিক সরঞ্জাম: চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা (২৮,৩২৪ কোটি টাকা)। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সামরিক বাহিনীর পুরো বাজেটই ছিল ৪২,৪৯৭ কোটি টাকা। • ঋণের বোঝা: রাষ্ট্রীয় দৈনন্দিন পরিচালনা ব্যয় মেটাতে গত ছয় মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে লাগবে আরও ১,০৬,০০০ কোটি টাকা। এছাড়া ভারতের আদানি গ্রুপে বকেয়া প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা।

যেখানে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, গঙ্গা ব্যারেজ, মেট্রোরেল এবং সড়ক যোগাযোগের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের সংকট, সেখানে হাজার হাজার কোটি টাকার এই সামরিক ও বাণিজ্যিক কেনাকাটা দেশের অর্থনীতিকে তীব্র ঝুঁকিতে ফেলছে।

রাজনীতির গতিপথ ও জনগণের প্রত্যাশা

পূর্ববর্তী সরকারের নীতির মতোই বর্তমান প্রশাসনও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে সন্তুষ্ট করার নীতি গ্রহণ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা কিংবা মূলধারার গণমাধ্যমের নীরবতা। কোনো প্রকার সত্যতা যাচাই বা প্রশ্ন না তুলে সংবাদ মাধ্যমগুলো তথ্য প্রচার করে চলেছে।

জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর দেশবাসী যে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিল, তা আজ গভীর প্রশ্নের মুখে। সাধারণ জনগণের স্বার্থকে পেছনে ফেলে কেবল আন্তর্জাতিক মহলকে তুষ্ট করার এই রাজনীতি দেশের ভবিষ্যতের জন্য কতটা শুভ, তা নিয়ে আজ বড় ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)