মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

অসহ্য যন্ত্রণা আর শেষ আকুতি:পাঁচটি চিরকুটে ঢাকা পড়ল এক সাংবাদিকের বর্ণিল জীবন:বিদায় প্রিয়াঙ্কা, থেমো না প্রকৃতি: কলম থেমে যাওয়ার পর লিখে যাওয়া শেষ ভালোবাসার দলিল

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১২ পিএম
অসহ্য যন্ত্রণা আর শেষ আকুতি:পাঁচটি চিরকুটে ঢাকা পড়ল এক সাংবাদিকের বর্ণিল জীবন:বিদায় প্রিয়াঙ্কা, থেমো না প্রকৃতি: কলম থেমে যাওয়ার পর লিখে যাওয়া শেষ ভালোবাসার দলিল

শরীরের তীব্র যন্ত্রণা আর বেঁচে থাকার অদম্য আকুতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষ কখন আত্মহননের পথ বেছে নেয়? জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন ক্ষুরধার সাংবাদিকের হৃদয় কতটা নিংড়ে উঠলে, কতটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লে নিজের জীবনের ইতি টানতে হয়—তারই এক করুণ উপাখ্যান রেখে গেলেন সিনিয়র সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জী। বরিশাল নগরীর প্যারা রোডের সমকাল ব্যুরো অফিসের একটি বদ্ধ ঘর থেকে যখন তাঁর নিথর ও ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হলো, তখন সেদেহের পাশে পড়ে থাকা পাঁচটি ছোট চিরকুট যেন কেবল কাগজের টুকরো ছিল না; সেগুলো ছিল এক যন্ত্রণাদ্ধ আত্মার বিদায়সংবাদ, এক ভালোবাসার কান্না আর স্বজনদের প্রতি শেষ বারের মতো আঁকড়ে ধরার আকুল প্রার্থনা।

দৈনিক সমকালের বরিশালের সাবেক এই ব্যুরো প্রধানের বিদায় শুধুই একটি মৃত্যুর খবর নয়, এটি এক দীর্ঘ সামাজিক ও শারীরিক যন্ত্রণার অবসান। শরীরের অসহ্য রোগ আর তার সাথে লড়াই করতে করতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। দেশের সীমানা পেরিয়ে ভারতের ভেলোর পর্যন্ত ছুটে গিয়েছিলেন একটু সুস্থতার আশায়, কিন্তু নিয়তির কাছে হার মানতে হয়েছিল তাঁকে। যে সাংবাদিক একসময় সমাজের অন্যায়, মানুষের কষ্ট আর জীবনসংগ্রামের কথা খবরের পাতায় তুলে আনতেন, অসুস্থতা ও চাকরি হারানোর যন্ত্রণা তাঁকে নিঃশব্দে ঠেলে দিয়েছিল এক গভীর বিষাদের অন্ধকার গহ্বরে।

প্রশাসনের উদ্দেশে লেখা চিরকুটে তাঁর সেই অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে সুস্পষ্টভাবে। সেখানে কোনো ক্ষোভ ছিল না, ছিল কেবলি নিজের অসুস্থতার কারণে সামাজিক ও শারীরিকভাবে পিছিয়ে পড়ার এক বেদনাদায়ক স্বীকারোক্তি। মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী না করে, শুধু বিনীত আবেদন রেখে গেছেন—তাঁকে যেন আর কোনো আইনি হয়রানির মধ্যে না ফেলে প্রিয়জনদের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

প্রিয়তমা স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা আর আদরের কন্যা প্রকৃতির জন্য তাঁর লিখে যাওয়া কথাগুলো যেন বিষাদের এক মহাকাব্য। "আমাকে ক্ষমা করে দিও... প্রকৃতি, তুমি পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যেও,"—একজন বাবার এই শেষ বার্তা যেন যেকোনো মানুষের হৃদয়কে চুরমার করে দেয়। প্রিয়াঙ্কাকে উদ্দেশ্যে করে তাঁর আকুলোক্তি, "আমার অনুপস্থিতি তোমার জীবনে পূরণ হবার নয়,"—মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নিজের ভালোবাসাকে শান্ত করার এমন করুণ চেষ্টা খুব কমই দেখা যায়। নিজের ভাই দীপকের ওপর অর্পিত দায়িত্ব আর বিশ্বাস তাঁকে একদিক থেকে সান্ত্বনা দিলেও, রেখে গেছে এক গভীর কষ্টের ছাপ।

দীর্ঘদিন ধরে চলা সহকর্মী সুমন চৌধুরীর কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন তিনি, প্রায় দেড় দশকের যৌথ কাজের স্মৃতির কথা স্মরণ করে অনুরোধ জানিয়েছেন বকেয়া পাওনাটুকু অন্তত তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দিতে। আর সাংবাদিকতার চিরদিনের সহযোদ্ধা এসএম জাকির হোসেনকে জানিয়েছেন সহজ এক বিদায়সম্ভাষণ, যার মধ্যে লুকিয়ে ছিল পরম স্বস্তি আর পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিনীত অনুরোধ।

যে কার্যালয়ে একসময় তাঁর কলমের শব্দে নতুন খবর জন্ম নিত, ২০২৩ সালে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর সেই চেনা জায়গাটিই যেন হয়ে উঠেছিল তাঁর বিষাদময় আশ্রয়স্থল। অবশেষে শুক্রবার সন্ধ্যায় সেই অফিসের বদ্ধ দরজার ওপাশ থেকেই সমাপ্তি ঘটল এক বর্ণিল সাংবাদিক জীবনের। পাঁচটি চিরকুটে লেখা ভালোবাসার এই অমর দলিলগুলো আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল—মানুষ কতটা যন্ত্রণায় পুড়লে নিজের প্রাণ প্রদীপটি নিজ হাতে নিভিয়ে দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)