মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী, রাসলীলা ও বস্ত্রহরণ: এক আধ্যাত্মিক পাঠ

লিখেছেন: সোর্স নিউজ ডেস্ক প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৪১ পিএম
শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী, রাসলীলা ও বস্ত্রহরণ: এক আধ্যাত্মিক পাঠ

বাংলা ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধরাধামে অবতীর্ণ হন। সেই হিসেবে ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার ছিলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন। অষ্টমী তিথি শুরু হয়েছিল ৪ সেপ্টেম্বর ভোর ২টা ২৫ মিনিটে এবং শেষ হয় ৫ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১৩ মিনিটে। এই দিনে ভক্তরা সারাদিন উপবাস বা ব্রত পালন করেন এবং মধ্যরাতে নিশীথ কালে বিশেষ পূজার মাধ্যমে কৃষ্ণের জন্মোৎসব ও অভিষেক সম্পন্ন হয়।

নতুন পাঠকদের জন্য বলে রাখা ভালো — হিন্দু পঞ্জিকা বা বৈদিক সময়গণনা অনুযায়ী সূর্য ও চন্দ্রের আপেক্ষিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত চাঁদের একটি বিশেষ অবস্থানকে বলা হয় তিথি। অমাবস্যা থেকে পরবর্তী পূর্ণিমা পর্যন্ত পনেরো দিনের সময়কালকে বলে শুক্লপক্ষ, আর পূর্ণিমার পরের পনেরো দিন হলো কৃষ্ণপক্ষ। প্রতিটি পক্ষেই একটি করে অষ্টমী তিথি থাকে, আর চান্দ্র মাস ২৯ বা ৩০ দিনের যে কোনোটিই হোক না কেন, মোট তিথির সংখ্যা সবসময় ৩০।

শ্রীকৃষ্ণ হিন্দুধর্মের একজন প্রধান দেবতা, যিনি বিষ্ণুর অষ্টম অবতার এবং অনেকের কাছে স্বয়ং পরমেশ্বর হিসেবে পূজিত হন। তাঁর জন্মদাতা পিতা-মাতা বাসুদেব ও দেবকী, আর পালক পিতা-মাতা নন্দ ও যশোদা। জন্ম হয়েছিল মথুরার কারাগারে। বলরাম ও সুভদ্রা তাঁর সহোদর ভাইবোন।

রাসলীলা ও বস্ত্রহরণ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি

শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা এবং বস্ত্রহরণ হিন্দু পুরাণের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। বাংলাদেশে অনেকের মধ্যেই এই দুটি ঘটনা নিয়ে নানা বিভ্রান্তি দেখা যায় — কেউ কেউ জেনে বা না জেনে এগুলোকে জাগতিক প্রেম বা সাধারণ ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করে কৃষ্ণভক্তদের বিশ্বাসকে ছোট করার চেষ্টা করেন। সেই ভুল বোঝাবুঝি দূর করার একটা প্রচেষ্টা হিসেবেই এই লেখা।

রাসলীলা হলো শ্রীকৃষ্ণ এবং বৃন্দাবনের গোপীদের মধ্যকার ঐশ্বরিক ও আধ্যাত্মিক প্রেমের এক উৎসব — কোনো পার্থিব বা জাগতিক প্রেম নয়। শরৎকালের এক পূর্ণিমা রাতে শ্রীকৃষ্ণ যখন বাঁশি বাজান, সেই সুরে মোহিত হয়ে গোপীরা ঘর-সংসার ভুলে যমুনার তীরে ছুটে আসেন। কারো মনে যেন অহংকার না জন্মায়, আর প্রত্যেকেই যেন কৃষ্ণকে নিজের কাছে পান — সেজন্য শ্রীকৃষ্ণ অলৌকিকভাবে বহু রূপ ধারণ করে প্রতিটি গোপীর সাথে বৃত্তাকারে নৃত্য করেন।

সনাতন ধর্মে রাসলীলাকে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এখানে কাম বা জাগতিক লালসার কোনো স্থান নেই; এটি সম্পূর্ণ নিষ্কাম ভক্তি ও প্রেমের প্রকাশ। শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে বহু রূপে প্রকাশ করেছিলেন যাতে প্রতিটি গোপী মনে করেন কৃষ্ণ কেবল তাঁর সাথেই নাচছেন — যার আধ্যাত্মিক অর্থ হলো, ঈশ্বর প্রতিটি জীবের হৃদয়ে সমানভাবে ও ব্যক্তিগতভাবে বিরাজ করেন।

বস্ত্রহরণের ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে বিতর্কিত মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও আত্মসমর্পণের বার্তা। বৃন্দাবনের কুমারী গোপীরা শ্রীকৃষ্ণকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার কামনায় এক মাস ধরে দেবী কাত্যায়নীর ব্রত পালন করছিলেন। ব্রতের শেষ দিনে তাঁরা যখন যমুনার জলে স্নান করছিলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের বস্ত্র নিয়ে একটি কদম্ব গাছে গিয়ে বসেন এবং জল থেকে উঠে এসে হাত জোড় করে বস্ত্র ফেরত নিতে বলেন।

এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভক্তদের মন থেকে লজ্জা, ভয় এবং দেহকেন্দ্রিক মোহ বা অহংকার দূর করা। আধ্যাত্মিক অর্থে — ঈশ্বরের কাছে কিছুই গোপন রাখা যায় না; পরমাত্মার সামনে জীবাত্মাকে সমস্ত অহংকার, বাসনা ও মায়ার আবরণ ত্যাগ করে সম্পূর্ণ পবিত্র হয়ে আত্মসমর্পণ করতে হয়।

সুফিবাদের সাথে ভাবগত সাদৃশ্য

বাহ্যিক দৃষ্টিতে রাসলীলা ও বস্ত্রহরণকে জাগতিক ঘটনা মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত দর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামের আধ্যাত্মিক ধারা সুফিবাদের সাথে এর কোনো সরাসরি ঐতিহাসিক সংযোগ নেই, তবে পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলনের আকাঙ্ক্ষা বা "প্রেমতত্ত্ব"-এর দিক থেকে দুটি ধারার মধ্যে একটি লক্ষণীয় ভাবগত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। পরমেশ্বরের কাছে পৌঁছাতে সাধককে তার সমস্ত জাগতিক পরিচয় ও অহংকার বিসর্জন দিয়ে নিষ্কলঙ্ক ও অনাবৃত হৃদয়ে আসতে হয় — এটি কামভাবের নয়, বরং পরম শুদ্ধতার প্রতীক।

বৈষ্ণব দর্শন ও সুফিবাদ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মীয় পটভূমি থেকে এসেছে। সুফিবাদ গড়ে উঠেছে পবিত্র কুরআন, হাদিস এবং ইসলামের একত্ববাদ (তাওহীদ)-এর ভিত্তিতে। তবু আধ্যাত্মিক সাধনার গভীর স্তরে ভাবগত ও রূপকের ব্যবহারে দুই ধারার মধ্যে কিছু আকর্ষণীয় সমান্তরালতা দেখা যায়: ইশক-এ-হাকিকি বা পরম প্রেম — বৈষ্ণব দর্শনে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম যেমন ঈশ্বরের প্রতি আত্মার তীব্র আকুলতা প্রকাশ করে, সুফিবাদেও স্রষ্টার প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসাকে বলা হয় "ইশক-এ-হাকিকি" বা ঐশ্বরিক প্রেম। জালালুদ্দিন রুমি বা হাফিজের কবিতায় স্রষ্টাকে "মাশুক" (প্রেমাস্পদ) এবং সাধককে "আশেক" (প্রেমিক) রূপে চিত্রিত করা হয়েছে, যা রাসলীলার মূল ভাবের সাথে তুলনীয়। রাসলীলায় গোপীরা যেমন নৃত্যের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব ভুলে কৃষ্ণের সত্তায় বিলীন হয়ে যান, সুফি দর্শনে একে বলা হয় "ফানা ফিল্লাহ" — আল্লাহর সত্তায় নিজের অহং বা নফসের অবসান।

বস্ত্রহরণ ও তাযকিয়াতুন নফস — বস্ত্রহরণে যেভাবে অহংকার ও লোকলজ্জার আবরণ খুলে ফেলার কথা বলা হয়েছে, সুফিবাদে ঠিক তেমনি কুপ্রবৃত্তি, দুনিয়াবি লোভ ও অহংকার দূর করার তাগিদ দেওয়া হয়, যাকে বলা হয় "তাযকিয়াতুন নফস" বা আত্মশুদ্ধি। সুফিদের মোটা পশমি কাপড় (সুফ) পরিধানের পেছনেও ছিল জাঁকজমক ও সামাজিক অহংকার ত্যাগের মানসিকতা — বাংলাদেশে অনেক সুফি সাধক আজও ছালা বা চটের পোশাক পরে থাকেন।

বাঁশির সুর ও সামা — শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুরে গোপীদের ব্যাকুল হওয়ার রূপকটি সুফি ঐতিহ্যেও সমানভাবে জনপ্রিয়। রুমি ও তাঁর অনুসারী মৌলভি তরিকার দরবেশদের আধ্যাত্মিক সঙ্গীত ও নৃত্যের ধারা — যাকে বলা হয় সামা — রাসলীলার বৃত্তাকার নৃত্যের আধ্যাত্মিক ভাবের একটি সমান্তরাল রূপ। রুমির মসনভিতে বাঁশিকে দেখানো হয়েছে মূল উৎস অর্থাৎ স্রষ্টা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া আত্মার ক্রন্দন হিসেবে।

মৌলিক পার্থক্য

ভাবগত মিল থাকলেও দুই ধারার মূল বিশ্বাসে বড় পার্থক্য রয়েছে। রাসলীলায় ঈশ্বর সাকার রূপ ধারণ করে লীলা করেন, অন্যদিকে সুফিবাদে আল্লাহকে সম্পূর্ণ নিরাকার, অদ্বিতীয় ও মহাবিশ্বের পরম নিয়ন্ত্রক হিসেবে মেনে তাঁর আধ্যাত্মিক নৈকট্য খোঁজা হয়।

ভারতবর্ষে মধ্যযুগে সুফি সাধক ও সনাতন ধর্মের ভক্তি আন্দোলনের সাধকদের (যেমন কবির, মীরাবাঈ) মিলনের মধ্য দিয়ে এই দুই ধারার ভাবের যে আদান-প্রদান ঘটেছিল, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক বিশাল মানবিক ও উদার চেতনার জন্ম দিয়েছিল — যা আজও আন্তঃধর্মীয় সংলাপের এক সুন্দর দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

সোর্স নিউজ ডেস্ক