মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

দেশের মাটিতে ফেরার আকুলতা ও স্বজনহারা নেত্রীর অবিনাশী পথচলা: দ্য হিন্দু-কে দেওয়া শেখ হাসিনার হৃদয়স্পর্শী সাক্ষাৎকার পর্যালোচনা ।

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২:৫২ পিএম
 দেশের মাটিতে ফেরার আকুলতা ও স্বজনহারা নেত্রীর অবিনাশী পথচলা: দ্য হিন্দু-কে দেওয়া শেখ হাসিনার হৃদয়স্পর্শী সাক্ষাৎকার পর্যালোচনা ।

এক অবিনাশী সংগ্রামের আখ্যান

রাজনীতির পথ কখনোই মসৃণ নয়, তবে দেশ ও মানুষের সাথে আত্মিক বাঁধন যিনি গড়তে পেরেছেন, দূরত্ব বা নির্বাসন তাকে কখনো বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। টানা ১৫ বছর এবং মোট পাঁচ মেয়াদে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া শেখ হাসিনাকে আজ সাময়িকভাবে দেশের বাইরে অবস্থান করতে হচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টের সেই ঝোড়ো দিনগুলোর পর থেকে একপ্রকার নিভৃতেই ছিলেন তিনি। দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে ভারতীয় সংবাদপত্র দ্য হিন্দু-কে দেওয়া তাঁর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি হয়ে উঠেছে মাতৃভূমির প্রতি এক অতল ভালোবাসা, দেশবাসীর প্রতি অবিচল আস্থা এবং সত্যের আলোয় ঘুরে দাঁড়ানোর এক গভীর আবেগঘন দলিল।

রক্তঝরা ৫ আগস্ট: হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ও দেশের মানুষের প্রতি মায়া

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই উঠে আসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের স্মৃতি—যেদিন নিজের প্রিয় জন্মভূমি থেকে তাঁকে সাময়িকভাবে দূরে সরে যেতে হয়েছিল। স্বদেশের মাটি ছেড়ে দূরে থাকার যন্ত্রণা কতটা গভীর, তা শেখ হাসিনার ব্যাকুল কণ্ঠেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনা অত্যন্ত ভালোবাসার জায়গা থেকে জানান, তিনি কখনো নিজ ইচ্ছায় প্রিয় বাংলাদেশ ছাড়েননি। মানুষের যেন আরও প্রাণহানি না ঘটে এবং রক্তপাত বন্ধ হয়—কেবল দেশবাসীর জীবনের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতেই তাঁকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল।

তিনি জানান, সহকর্মীদের অনুরোধে এবং বোনকে সুরক্ষিত রাখতে তাঁকে স্থান ত্যাগ করতে হয়েছিল। এমনকি হেলিকপ্টারে ওঠার পর তিনি জানতে পারেন যে তাঁকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নিজের ঘরবাড়ি ও ভালোবাসার দেশ ছেড়ে আসার পেছনে যে অপরিসীম বেদনা লুকিয়ে ছিল, তা কেবল একজন মাতৃতুল্য অভিভাবকের পক্ষেই বহন করা সম্ভব।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: আস্থার ঠিকানা ভারত ও ভালোবাসার স্বদেশ

শেখ হাসিনার পুরো জীবনটাই যেন এক মহাকাব্যিক লড়াই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন তিনি হারিয়েছিলেন পিতা বঙ্গবান্ধুসহ প্রায় পুরো পরিবারকে, তখনও তিনি ছিলেন প্রবাসে। ভারত সরকার তাঁকে সেদিন বোনসহ আশ্রয় দিয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে সব বাঁধা পেরিয়ে কোটি মানুষের ভালোবাসা সম্বল করে তিনি দেশে ফিরেছিলেন। ২০০৭ সালেও তাঁকে দূরে রাখার চক্রান্ত হয়েছিল, কিন্তু জনগণের টানে তিনি বারবার ফিরে এসেছেন।

দ্য হিন্দু-কে শেখ হাসিনা বলেন, ইতিহাস আজ যেন আবারও এক বিশেষ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। জীবনের এই পর্বেও তিনি ভারতের আতিথেয়তায় কৃতজ্ঞ, কিন্তু তাঁর হৃদয় পড়ে আছে বাংলাদেশের মাটিতেই। অন্য কোথাও রাজনৈতিক আশ্রয় না নিয়ে দেশের এত কাছে অবস্থান করার কারণ একটাই—যাতে নিজের দেশের মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ তিনি শুনতে পান। গভীর প্রত্যয়ের সাথে তিনি প্রকাশ করেন, জনগণের দোয়া ও সৃষ্টিকর্তার কৃপায় তিনি আবারও তাঁর প্রিয় দেশবাসীর মাঝে ফিরে যাবেন।

বাকস্বাধীনতা ও সত্যের জয়গান

ভারতে অবস্থানকালে তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করার চেষ্টার বিষয়ে শেখ হাসিনা বিস্ময় প্রকাশ করেন। একটি সাক্ষাৎকার বা মানুষের সাথে কথা বলা কীভাবে দুটি দেশের সম্পর্কে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে—এ প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সত্য প্রকাশ করা এবং কথা বলা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার।

গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ওপর নিজের গভীর বিশ্বাসের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, বাকস্বাধীনতা হলো সমাজের প্রাণশক্তি। দেশের সাংবাদিক, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের কণ্ঠ যাতে রুদ্ধ না হয়, সেই সত্যকে তিনি আবারও বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছেন।

‘আমার মানুষ’: স্বজনহারা ও নির্যাতিত কর্মীদের প্রতি মায়ের স্নেহ সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও আবেগঘন অংশ ছিল যখন তিনি 'আমার মানুষ' শব্দবন্ধটির ব্যাখ্যা দেন। দীর্ঘ পথচলায় যে লক্ষ লক্ষ কর্মী ও সমর্থক তাঁর ওপর আস্থা রেখেছেন, যারা আজ নানা প্রতিকূলতা ও কষ্টের মুখোমুখি—তাদের প্রতি নেত্রীর গভীর মাতৃতুল্য টান ফুটে ওঠে।

তিনি ব্যাকুল হয়ে বলেন, যাদের জীবন আজ সংকটে, যারা মিথ্যার বেড়াজালে বন্দী, আমি কীভাবে তাদের ভুলে থাকব? তবে কেবল দলীয় কর্মীই নয়, পুরো দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষই তাঁর নিজের। স্বজনহারানো পরিবারগুলোর প্রতি তাঁর সহানুভূতি এবং দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আকুলতা প্রমাণ করে, কোনো ভৌগোলিক দূরত্বই জনগণের প্রতি তাঁর এই অন্তহীন ভালোবাসা কমাতে পারেনি।

সংগ্রামের অদম্য আলো ও আলোর দিশা

নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও দায়িত্ব নিয়ে শেখ হাসিনা স্পষ্ট ও সুদৃঢ় মতামত ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, দল ও দেশের মানুষ যা চাইবে, তিনি সবসময় তাতেই প্রস্তুত। পদ বা ক্ষমতার চেয়ে তাঁর কাছে বড় হলো গণতান্ত্রিক আদর্শ এবং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষা। বঙ্গোপসাগর বা দেশের সার্বভৌমত্ব যেন কোনো বাহ্যিক ক্ষতির মুখে না পড়ে—সে বিষয়ে তাঁর দূরদর্শী সতর্কবার্তা একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের দায়িত্ববোধকেই প্রতিফলিত করে।

বারবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এবং জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও দেশের জন্য লড়ে যাওয়া এই নেত্রী এখনো আশায় বুক বেঁধে আছেন। সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশ আবার শান্তি, অগ্রগতি ও ভালোবাসার পথে ফিরে আসবে—এই বিশ্বাসই তাঁর প্রবাস জীবনের প্রধান শক্তি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তিনি যে সুবিচারের আকুতি জানিয়েছেন, তা পরাজয়ের সুর নয়—বরং এটি সত্য, ন্যায় এবং দেশের মানুষের কাছে আবার ফিরে যাওয়ার এক অবিনাশী অঙ্গীকার।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)