ডেঙ্গুতে একদিনে আরও ৫ মৃত্যু, ১৭ দিনে প্রাণ গেল ৭৯ জনের: প্রতিটি পরিসংখ্যানে লুকিয়ে আছে এক-একটি নিভে যাওয়া স্বপ্নের হাহাকার
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৬ জনে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৪৮৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৫ জনের মধ্যে ৪ জন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা। অন্যজন রংপুর বিভাগের বাসিন্দা। একই সময়ে সবচেয়ে বেশি ২৫২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন খুলনা বিভাগে।
এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২২৭ জন, বরিশাল বিভাগে ২১১ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২০৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯২ জন, ঢাকা বিভাগে ১৯০ জন, রাজশাহী বিভাগে ১০২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৬৪ জন, রংপুর বিভাগে ৩৫ জন এবং সিলেট বিভাগে ৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চলতি সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং আগস্টে ৪৩ জন ডেঙ্গুতে মারা যান। আর সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৭ দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন ৭৯ জন।
বছরের শুরু থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। দুই সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগে মারা গেছেন ৮৪ জন। এছাড়া খুলনা বিভাগে ৩২ জন, ময়মনসিংহে ১৮ জন, চট্টগ্রামে ১৬ জন, বরিশালে ১৩ জন, রাজশাহীতে ৮ জন, রংপুরে ৪ জন এবং সিলেট বিভাগে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
প্রতিদিন স্বাস্থ্য বুলেটিনে আমরা যে সংখ্যাগুলো দেখি—১৭৬, ৭৯ কিংবা ৫—আমাদের কাছে এগুলো শুধুই কিছু গাণিতিক হিসাব বা খবরের শিরোনাম। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে বোঝা যায়, প্রতিটি সংখ্যার আড়ালে চাপা পড়ে আছে একেকটি পরিবারের কান্না, রক্তক্ষরণ আর সারা জীবনের এক নিঃশব্দ হাহাকার। ৫ জন মানুষ মারা যাওয়ার অর্থ হলো, ৫টি ঘরে আজ রান্নার হাঁড়ি ওঠেনি, ৫টি ঘরের আলো চিরতরে নিভে গেছে। কোনো সন্তান হয়তো আজ গভীর রাতে দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবছে তার বাবা আর কোনোদিন ফেরাবে না, কোনো মা হয়তো কোলের ছোট্ট পোশাকটি বুকে চেপে ধরে দিশেহারা হয়ে কাঁদছেন।
হাসপাতালের আইসিইউর সামনে জমানো এই ভয় আর অনিশ্চয়তার কোনো পরিসংখ্যান হয় না। এনএস১ টেস্ট পজিটিভ আসার পর থেকে শুরু হয় প্লাটিলেট গণনার এক নির্মম যুদ্ধ। যখনই প্লাটিলেট কমতে থাকে, ঠিক তখনই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে থাকে স্বজনদের স্বপ্ন ও মনোবল। স্যালাইনের বোতল থেকে ফোঁটা ফোঁটা তরল ঝরার সাথে সাথে যেন শেষ হয়ে আসে একটি পরিবারের আশার প্রদীপ। হাসপাতালের করিডোরে কান পাতলে শুধুই হাহাকার আর স্বজনদের আর্তনাদ শোনা যায়—যেখানে একটুখানি রক্তের প্লাটিলেটের জন্য হন্যে হয়ে ছুটছে মানুষ, যেখানে জীবন আর মৃত্যুর দূরত্ব আটকে থাকে একটি ছোট মশার কামড়ে।
একটি ছোট্ট মশা কত সহজভাবে কেড়ে নিচ্ছে আমাদের বেঁচে থাকার আনন্দ, থামিয়ে দিচ্ছে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৭ দিনেই ৭৯টি প্রাণ ঝরে যাওয়ার অর্থ হলো, আমাদের চারপাশের বাতাস এখন কেবলই প্রিয়জন হারানোর শোকে ভারী হয়ে উঠছে। ঢাকা থেকে খুলনা, বরিশাল থেকে রংপুর—দেশের প্রতিটি প্রান্ত আজ একই আতঙ্কে কাঁপছে। প্রতিটি শূন্য চেয়ার, প্রতিটি খালি বিছানা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কেমন এক অদৃশ্য শত্রুর সাথে প্রতিদিন হেরে যাচ্ছি।
পরিসংখ্যান আমাদের সংখ্যার হিসেব দিতে পারে, কিন্তু যে বাবা তার সন্তানকে হারিয়ে বাড়ি ফিরেছেন—তার বুকের ভেতরে জমা হওয়া বিশাল শূন্যতার পরিমাপ কোনো স্কেলে করা সম্ভব নয়। ডেঙ্গু কেবল একটি জ্বর নয়, এটি আজ অসংখ্য পরিবারের সাজানো স্বপ্ন চুরমার করে দেওয়ার এক নির্মম ট্র্যাজেডি। আমরা কি পারি না কেবল পরিসংখ্যানের অংশ না হয়ে, নিজ নিজ জায়গা থেকে একটু সচেতন হতে, যাতে কাল কোনো মায়ের কোল আর খালি না হয়?
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)