সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

বিবেক ও আত্মমর্যাদার দলিল: নির্মলেন্দু গুণের কাছে লেখা শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক চিঠি

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৯ অক্টোবর ২০২৬, ৬:৪৭ পিএম
বিবেক ও আত্মমর্যাদার দলিল: নির্মলেন্দু গুণের কাছে লেখা শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক চিঠি

বন্ধু বরেষু গুণ,

আপনার অনুরোধে কিছু ছবি পাঠালাম। তবে আমার একটা অনুরোধ রাখবেন। ত্রাণ বিতরণ করছি এধরনের কোন ছবি কবিতার বইয়ে ছাপাবেন না। মানুষের দুর্দশার ছবি যত পারেন ছাপান। আমার ধারণা এ ধরনের অর্থাৎ ত্রাণ বিতরণের ছবি টেলিভিশন ও খবরের কাগজে দেখে দেখে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে গেছে। ওরা গরিব, কিন্তু সেটা কি ওদের অপরাধ? একশ্রেণী যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ না করত তাহলে এরা কি গরিব হতো? কার ধন কাকে বিলাচ্ছে? যা কিছু আছে সকলে মিলে ভাগ করে ভোগ করলে একের কাছে অপরের হাত পাতার প্রয়োজন হতো না।

ওদেরই সম্পদ লুট করে সম্পদশালী হয়ে আবার ওদেরই দুর্দশার সুযোগ নিয়ে সাহায্যদানের নামে হাতে তুলে দিয়ে ছবি ছাপিয়ে ব্যক্তিগত ইমেজ অথবা প্রতিষ্ঠা লাভের প্রয়াস আমি মানসিকভাবে কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। আমার বিবেকে বাধে। তবুও অনেক সময় পারিপার্শ্বিক চাপে পড়ে অনেক কিছুই করতে হয়। আমিও করি। বিবেকের টুঁটি চেপে ধরে অনেক সময় সমাজ রক্ষার তাগিদে, সাথীদের অনুরোধ বা অপরের মান রক্ষার জন্য এ ধরনের কাজ বা ছবি তুলতে হয় বৈকি। তবে যে যাই দান করুক না কেন, বিলি করুক না কেন, এটা তো ওই গরিব মানুষগুলোর অধিকার, তাদেরই প্রাপ্য। ক্ষমতার দাপটে কেড়ে নেয়া ওদেরই সম্পদ অথবা ওদের পেটের ক্ষুধা দেখিয়ে দেশ-বিদেশ থেকে ভিক্ষে এনে এদের দান করা। এখানে ক্রেডিট নেয়ার সুযোগ কোথায়?

এই ক্রেডিট নিতে যাওয়াটা কি দুর্বলতা নয়? আত্মপ্রবঞ্চনা নয়? কতকাল আর বিবেককে ফাঁকি দেবে? এই গরিব মানুষগুলোর মুখের গ্রাস কেড়ে খেয়ে আবার এদেরই হাতে ভিক্ষে তুলে দিয়ে ছবি ছাপিয়ে ইমেজ তৈরির পদ্ধতি আমি পছন্দ করি না। আমি মনে করি যা দান করব তা নীরবে করব, গোপনে করব। কারণ এটা লজ্জার ব্যাপার, গর্ব করার ব্যাপার মোটেই নয়। গর্ব করার মতো কাজ হতো যদি এই সমাজটাকে ভেঙে নতুন সমাজ গড়া যেত। গর্ব করার মতো হতো যদি একখানা কাঙালের হাতও সাহায্যের জন্য বাড়িয়ে না দিত।

ফুটপাথে কঙ্কালসার দেহ নিয়ে ভিক্ষের হাত না বাড়াত সেটাই গর্ব করার মতো হতো। যে স্বপ্ন আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন, সে দিন কবে আসবে? আমার অনুরোধ আপনার কাছে, সেই ছবি ছাপাবেন না যে ছবি হাত বাড়িয়েছে সাহায্য চেয়ে, আর সেই হাতে কিছু তুলে দিচ্ছি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। অনেকেই তুলে থাকেন। আমার বড় অপরাধী মনে হয় নিজেকে। লজ্জা হয় গরিব মানুষদের কাছে মুখ দেখাতে আমরা সমাজে বাস করি। দুবেলা পেট পুরে খেতে পারি। ভালোভাবে বাঁচতে পারি। কিন্তু ওরা কি পাচ্ছে? ওদের নিয়ে এ ধরনের উপহাস করা কেন? ওরা বরদাশত করবে না, একদিন জেগে উঠবেই। সেদিন কেউ রেহাই পাবে না। আমার অনুরোধ আশা করি রাখবেন।

শুভেচ্ছান্তে, শেখ হাসিনা ০৯/১০/১৯৮৮ ইং

গরিবের অধিকার কোনো দয়া নয়’: শেখ হাসিনার চিঠিতে মানবিক দর্শনের প্রতিচ্ছবি

১৯৮৮ সালে কবি নির্মলেন্দু গুণের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনার লেখা চিঠিটি শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত পত্র নয়, এটি এক গভীর রাজনৈতিক দর্শন, মানবিক মর্যাদা এবং মানুষের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধাবোধের এক অনন্য দলিল। এই চিঠির প্রতিটি পঙক্তিতে ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর অন্তরের নিখাদ ভালোবাসা এবং আত্মিক দায়বদ্ধতা।

চিঠির শুরুতেই ত্রাণ বিতরণের ছবি কবিতার বইয়ে ছাপাতে নিষেধ করে শেখ হাসিনা যে আপসহীন মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা মানুষের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছেন যে, গরিব মানুষের দুর্দশার ছবি বা ত্রাণ বিতরণের দৃশ্য গণমাধ্যমে প্রচার করে নিজের ব্যক্তিগত ইমেজ বা প্রতিষ্ঠা অর্জনের প্রচেষ্টা এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা এবং অসহায় মানুষের উপহাস। তাঁর মতে, সমাজের মুষ্টিমেয় মানুষের অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ ও বঞ্চনার ফলেই মানুষের এই দুর্গতি তৈরি হয়েছে। তাই তথাকথিত ‘সাহায্য’ আসলে কোনো দয়া নয়, বরং তা ওই বঞ্চিত মানুষেরই নায্য অধিকার। ক্ষমতার দাপটে কেড়ে নেওয়া সম্পদ তাদেরই ফিরিয়ে দেওয়ার সময় কৃতিত্ব জাহির করাকে তিনি চরম লজ্জার বিষয় বলে মনে করেছেন। শেখ হাসিনার এই চিঠিতে সমাজ পরিবর্তনের এক দূরদর্শী চিন্তাভাবনাও প্রকাশ পেয়েছে। তিনি মনে করেন, দান বা সাহায্য নীরবে ও গোপনে করা উচিত, কারণ এটি গর্বের নয় বরং লজ্জার। গর্ব করার মতো পরিস্থিতি তখনই সৃষ্টি হতো, যখন এই বৈষম্যমূলক সমাজ ভেঙে একটি নতুন সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হতো এবং ফুটপাথে কোনো ক্ষুধার্ত মানুষকে সাহায্যের জন্য হাত বাড়াতে হতো না। তাঁর বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলার লক্ষ্যও ছিল এমন একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।

পরিশেষে, এই চিঠিটি মানুষের মৌলিক অধিকার, আত্মসম্মান এবং মানবিক বোধের প্রতি শেখ হাসিনার গভীর শ্রদ্ধাবোধের এক অমর স্মারক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের দুঃখ-দুর্দশাকে পুঁজি করে প্রচার পাওয়ার মানসিকতা অমানবিক, এবং প্রকৃত মানবতা লুকিয়ে থাকে নীরবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: