শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

মার্কিন বিশেষ দূতের ঢাকা সফর: বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতি, চীন-রাশিয়া ঘনিষ্ঠতা ও ওয়াশিংটনের কৌশলগত বার্তা।

লিখেছেন: অভয় সরকার প্রকাশিত: ২১ জুলাই ২০২৬, ৬:০৯ পিএম
মার্কিন বিশেষ দূতের ঢাকা সফর: বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতি, চীন-রাশিয়া ঘনিষ্ঠতা ও ওয়াশিংটনের কৌশলগত বার্তা।

বাংলাদেশের পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে চলতি জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ঢাকা সফরে আসছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় পাঁচ মাস পর এটি হবে তাঁর প্রথম বাংলাদেশ সফর, যা কূটনৈতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পরিচালনার জন্য নয়, বরং বিশেষ কৌশলগত বা নীতিগত বার্তা আদান-প্রদানের উদ্দেশ্যেই এ ধরনের বিশেষ দূত পাঠানো হয়। সে কারণে সার্জিও গোরের সফরকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি এবং কৌশলগত অগ্রাধিকার সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মূল্যায়নের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্জিও গোরকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা এই কূটনীতিক সরাসরি হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেন। চীন সফরের পর মার্কিন আগ্রহ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের এক মাসের মধ্যেই মার্কিন বিশেষ দূতের ঢাকা সফর কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, মোংলা সমুদ্রবন্দরের আধুনিকায়ন, চট্টগ্রামে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং অবকাঠামো বিনিয়োগসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা ও সমঝোতা হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও এগিয়ে নিতে "টু প্লাস টু" (পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ বৈঠক) কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে এবং চীনা সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের এই ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে সার্জিও গোরের সফরে এ বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে। বহুমুখী কূটনীতি পর্যবেক্ষণে ওয়াশিংটন শুধু চীন নয়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশ তুরস্ক, রাশিয়া ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কও জোরদার করেছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের ঢাকা সফর, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের মস্কো সফর এবং রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠক—এসব ঘটনাকে বাংলাদেশের বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগও বেড়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান তুরস্ক সফর করেছেন। সামরিক সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে আলোচনাও চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, বাংলাদেশের এই বহুমাত্রিক কূটনৈতিক তৎপরতা যুক্তরাষ্ট্র নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কোন বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে? কূটনৈতিক সূত্র ও বিশ্লেষকদের মতে, সফরে যেসব বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে— • বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার। • চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। • বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর বিষয়ে ঢাকার অবস্থান। • ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য। • পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি। • রোহিঙ্গা সংকট। • ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। • আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল। সফরসূচিতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক কূটনৈতিক সূত্র বলছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে ২৮ জুলাই দেশে ফিরতে পারেন। পরদিন সার্জিও গোর ঢাকা পৌঁছাতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর একান্ত বৈঠকের সম্ভাবনার পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং দেশের কয়েকটি প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিভিন্ন আলোচনা চলছে। কিছু কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, এসব ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন চলছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নীতি পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়া না হলেও পরিস্তিতি বদলের ইঙ্গিত মিলেছে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক এক দলীয় সভায় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে আওয়ামী লীগের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলে ভারতও বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে বলে আলোচনা রয়েছে। সফরের কৌশলগত তাৎপর্য বিশ্লেষকদের মতে, গত পাঁচ মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। একদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ছে, অন্যদিকে রাশিয়া, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। এই বাস্তবতায় সার্জিও গোরের ঢাকা সফর কেবল একটি নিয়মিত কূটনৈতিক সফর নয়; বরং বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মূল্যায়ন ও বার্তা আদান-প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।