মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

অনিশ্চয়তার আবহে কণ্ডারীর খোঁজে: তৃণমূলের রক্তক্ষরণ ও নেতৃত্বের প্রশ্ন

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২:৫৪ পিএম
অনিশ্চয়তার আবহে কণ্ডারীর খোঁজে: তৃণমূলের রক্তক্ষরণ ও নেতৃত্বের প্রশ্ন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ কেবল একটি দল নয়, বহু রাজনৈতিক ঝড়ের পথপ্রদর্শক এক দীর্ঘ ইতিহাসের নাম। তবে সাম্প্রতিককালের রাজনৈতিক রূপান্তর এবং দেশনেত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য অনুপস্থিতি বা কারাবরণের গুঞ্জন কেন্দ্র করে রাজপথ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এক গভীর অনিশ্চয়তা।

সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যম 'দ্য ওয়াল'-এর সাংবাদিক অমল সরকারের সাথে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ ফোনালাপের পর একটি খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে—নেত্রীর অনুপস্থিতিতে বা অবর্তমানে শেখ সেলিমই হচ্ছেন আওয়ামী লীগের অস্থায়ী কাণ্ডারী।

এই একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দলীয় অনুসারীদের আবেগ, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আনুগত্য এবং তৃণমূলের ক্ষোভ আজ সামনাসামনি দাঁড়িয়েছে। বিদেশে বসে দল চালানো, গঠনতন্ত্রের অজুহাত আর নেতৃত্বের উত্তরাধিকার—সব মিলিয়ে আওয়ামী রাজনীতি এখন এক কঠিন ও আবেগঘন সন্ধিক্ষণে।

জনতার প্রতিক্রিয়া: পাঁচ ভাগে বিভক্ত মতামত

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও দলীয় সর্বস্তরে প্রচারিত এই বক্তব্যকে ঘিরে সাধারণ সমর্থক ও কর্মীদের মতামত পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট পাঁচটি ভিন্ন স্রোত লক্ষ্য করা যায়: ১. গঠনতন্ত্রনির্ভর যৌক্তিক ধারা একটি অংশের সমর্থক অত্যন্ত রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টিকে দেখছেন। তাদের মতে, সংকটকালীন সময়ে দল কোনো ব্যক্তির ইচ্ছেমত চলতে পারে না, বরং নিয়ম বা গঠনতন্ত্রই শেষ কথা।

মূল বক্তব্য: সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বা মতিয়া চৌধুরীর মতো জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রয়াণ এবং অন্যান্য প্রেসিডিয়াম সদস্যদের কারাবরণের পর শেখ সেলিমই জ্যেষ্ঠতম সদস্য। তৃণমূলের সুর:

১/১১-এর রাজনৈতিক সংকটের সময় যেভাবে জিল্লুর রহমান জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, এটিও ঠিক তেমনই একটি স্বাভাবিক নিয়ম। অমল সরকারের প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা যা বলেছেন, তা নিছক গঠনতান্ত্রিক সত্য।

২. আনুগত্য ও 'শেখ হাসিনা কেন্দ্রিক' বিশ্বাস কর্মীদের বড় একটি অংশ কোনো রাজনৈতিক সমীক্ষা বা দলীয় সমীকরণে বিশ্বাস করতে নারাজ। তাদের কাছে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং একমাত্র দিকনির্দেশনা।

মূল বক্তব্য: "শেখ হাসিনা যাকে দায়িত্ব দেবেন, আমরা তাকেই মানবো। তিনি যদি একটি কলাগাছকেও নির্দেশক হিসেবে দাঁড় করান, কর্মী হিসেবে আমরা সেটাই মেনে নেব।"

তৃণমূলের সুর: নেতৃত্বের প্রশ্নে কোনো আপস নেই। নেত্রী বেঁচে থাকতে কিংবা জেলে গেলে কী কৌশল গ্রহণ করবেন, তা একমাত্র তিনিই ভালো বোঝেন।

৩. বিতর্ক, জল্পনা ও সাংবাদিকতার বিশ্লেষণ নিয়ে সন্দেহ অনেক কর্মী ও বিশ্লেষক পুরো সাক্ষাৎকার এবং এর রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে সন্দিহান। তাদের মতে, খবরটিকে অহেতুক 'টুইস্ট' করা হয়েছে।

মূল বক্তব্য: অমল সরকার নিজ থেকে শেখ সেলিমের নাম প্রস্তাব করেছেন; নেত্রী কেবল সিনিয়রিটির সাধারণ নিয়মের কথা বলেছেন।

তৃণমূলের সুর: আওয়ামী লীগের মতো দল বিদেশে বসে বা কোনো কৌশলগত ধোঁয়াশা তৈরি করে পুনর্গঠিত হতে পারে না। এই আলোচনাগুলো কর্মীদের মনোবল ভাঙার চক্রান্ত হতে পারে।

৪. তারুণ্যের চোখ ও 'জয়'-কেন্দ্রিক ভবিষ্যত

তৃণমূল ও তরুণ সমর্থকদের একটি বড় অংশ স্পষ্ট ভাষায় স্বজনপ্রীতি বা পুরনো সিন্ডিকেটকে প্রত্যাখ্যান করে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ওপর আস্থা প্রকাশ করছে।

মূল বক্তব্য: উপমহাদেশের রাজনীতির ধারায় (যেমন রাহুল গান্ধী বা বেনজীর ভুট্টো) নেতৃত্ব হস্তান্তরিত হলে তা কর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়।

তৃণমূলের সুর: শেখ সেলিমের মতো বিতর্কিত আত্মীয়দের হাতে নেতৃত্ব গেলে দল ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। যদি শেখ পরিবারের কাউকেই কান্ডারী করতে হয়, তবে সজীব ওয়াজেদ জয়ই একমাত্র গ্রহণযোগ্য মুখ।

৫. ক্ষোভ, স্বজনপ্রীতি বিরোধিতা ও রাজপথের প্রত্যাখ্যান সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও স্পষ্ট সুরটি এসেছে মাঠপর্যায়ের সেইসব কর্মীদের কাছ থেকে, যারা ২৪-এর রাজনৈতিক ঝড়ের পর সরাসরি রাজপথে আঘাত সহ্য করছেন।

মূল বক্তব্য: "নেত্রীর সবচেয়ে বড় ভুল ছিল আত্মীয়-স্বজনদের অতিমাত্রায় প্রশ্রয় দেওয়া।" তৃণমূলের সুর: এসি রুমে বসে রাজনীতি করা বা আত্মীয়করণের সিন্ডিকেটকে রাজপথের ক্ষুব্ধ তৃণমূল আর মেনে নেবে না। শেখ সেলিমকে যদি দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে আওয়ামী লীগের পুনর্জাগরণ চিরতরে বাধাগ্রস্ত হবে।

এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও তৃণমূলের আর্তনাদ

আওয়ামী লীগের ইতিহাস রাজপথের আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাস। কিন্তু আজকের এই সংকটকালীন মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের কর্মীরা যে প্রশ্নটি তুলছেন, তা কেবল কোনো পদের প্রশ্ন নয়—তা দলের অস্তিত্বের প্রশ্ন।

গঠনতন্ত্রের দোহাই দিয়ে জ্যেষ্ঠতার বিচারে কাউকেই দলের অভিভাবক বানানো সহজ, কিন্তু মাঠের রক্তভেজা কর্মীদের আস্থা অর্জন করা কঠিন। নেত্রীর একটি ইঙ্গিত বা সংবাদমাধ্যমের একটি বিশ্লেষণ হয়তো সাময়িক আলোচনার জন্ম দিতে পারে, কিন্তু দিনশেষে রাজপথে লড়াই করার জন্য প্রয়োজন একটি সর্বজনগ্রাহ্য ও ত্যাগী নেতৃত্ব। দলীয় আত্মীয়করণ নাকি নতুন দিনের নেতৃত্ব—আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এখন এই কঠিন সিদ্ধান্তের ওপরই ঝুলছে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)