মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

স্বাস্থ্য

মশার কামড়ে বিপন্ন জীবন: গ্রাম থেকে শহরে ডেঙ্গু ও হামের জোড়া থাবায় হাসপাতালে হাহাকার। সীমিত চিকিৎসা ব্যবস্থা,কম আইসিইউ এবং সচেতনতার অভাবে প্রান্তিক জনপদে বাড়ছে মানবিক বিপর্যয়

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৯ পিএম
মশার কামড়ে বিপন্ন জীবন: গ্রাম থেকে শহরে ডেঙ্গু ও হামের জোড়া থাবায় হাসপাতালে হাহাকার। সীমিত চিকিৎসা ব্যবস্থা,কম  আইসিইউ এবং সচেতনতার অভাবে প্রান্তিক জনপদে বাড়ছে মানবিক বিপর্যয়

জরুরি বিভাগের সামনে স্বজনদের কান্না আর আকুল আকুতি—একটি মাত্র আইসিইউ বেডের জন্য। হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দায় পাতলা চাদর বিছিয়ে কাতরাচ্ছে ডেঙ্গু ও হামে আক্রান্ত অবুঝ শিশুরা। এটি কোনো একক হাসপাতালের চিত্র নয়; রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের জেলা-উপজেলার সরকারি হাসপাতালগুলোর চিত্র এখন এমনই হৃদয়বিদারক। এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু এবং প্রাণঘাতী হামের দ্বৈত আক্রমণে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের আশঙ্কা, আগামী মাসের মধ্যে এই প্রাদুর্ভাব বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

এক নজরে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৯০ জন। অন্যদিকে, হামের প্রকোপে ৩ জনের মৃত্যু এবং ১,১১১ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। রাজধানী ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতাল এবং শিশু হাসপাতালসহ প্রায় প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রতিনিয়ত বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর ভিড়।

সীমান্ত পেরিয়ে গ্রামে গ্রামে এডিসের তাণ্ডব

অতীতে ডেঙ্গুকে মূলত রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক রোগ মনে করা হলেও, এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এডিস মশার বংশবিস্তার এখন গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী সামনে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এডিস মশা যেহেতু বাড়িঘর ও আশপাশের ডাব বা প্লাস্টিকের পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে বংশবৃদ্ধি করে, তাই সামনের দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বৃদ্ধির তীব্র আশঙ্কা রয়েছে।

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার বলেন, "সময়মতো এডিস মশা নিধন ও স্থায়ী ব্যবস্থাপনা না নেওয়ার কারণে রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যায়ে এডিস ছড়িয়ে পড়েছে। পূর্বে সিটি করপোরেশন কেন্দ্রিক উৎসগুলো নির্মূল করা গেলে মফস্বলে বিস্তার রোধ করা যেত। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা ও পৌরসভা স্তরে সমন্বিত মশক নিধন জোরদার করা এখনই জরুরি।" আইসিইউ-এর তীব্র সংকট ও ঢাকার ওপর বাড়তি চাপ

হাসপাতালগুলোতে সাধারণ বেডের পাশাপাশি আইসিইউ (ICU) শয্যার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যারা ইতিপূর্বে একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, এবার তাদের ক্ষেত্রে শারীরিক জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেশি।

ঢাকার বাইরের জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু ও হামের রোগীর মাত্রাতিরিক্ত চাপের কারণে স্থান সংকুলান হচ্ছে না। ফলে সংকটাপন্ন অবস্থায় রোগীরা দ্রুত উন্নত চিকিৎসার আশায় ঢাকায় ছুটে আসছেন। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান জানান, হাম পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব চিকিৎসাসেবার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। প্রথমবার ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের ৯০ শতাংশই প্রাথমিক চিকিৎসায় দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেছেন বলে তিনি জানান।

বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও প্রাথমিক করণীয়

ডেঙ্গু ও হাম উভয় রোগের চিকিৎসাব্যবস্থা অনেকাংশে উপসর্গভিত্তিক ও অভিন্ন হওয়ায় অযথা আতঙ্কিত না হয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন চিকিৎসকরা: • লক্ষণ ও পরীক্ষা: জ্বর, তীব্র মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথা কিংবা খাবারে অরুচি দেখা দিলে দ্রুত ডেঙ্গু এনএস-ওয়ান (NS1) পরীক্ষা করাতে হবে। • বিশেষ সতর্কতা: শিশু, গর্ভবতী মা, প্রবীণ ব্যক্তি এবং বহুমুখী রোগে (ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার বা ক্যান্সার) আক্রান্তদের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই বাড়তি খেয়াল রাখতে হবে। • রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ: শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা জানান, ডেঙ্গু হলে রক্তচাপ ঠিক আছে কিনা তা নিয়মিত মনিটর করা জরুরি। প্রেশার বিপজ্জনকভাবে না কমলে আইসিইউ বা বেডের জন্য ছোটাছুটি না করে হাসপাতালের বহির্বিভাগেই প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। • ডেঙ্গু কর্নার: মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ পরামর্শ দিয়েছেন যে, সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি দেশের সকল বেসরকারি হাসপাতালেও পৃথক ‘ডেঙ্গু কর্নার’ চালু করা প্রয়োজন।

সামাজিক প্রতিরোধ ও সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে ডেঙ্গু ও হাম মোকাবিলায় সরকারকে দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি সর্বাত্মক মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে কেবল সরকারি বা সিটি করপোরেশনের একক উদ্যোগে এই মহামারি রোধ করা সম্ভব নয়। নিজ নিজ বাড়ি-ঘর ও আঙিনা পরিষ্কার রাখা এবং জমা পানি অপসারণে সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। পাড়া-মহল্লায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল এই মানবিক বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)