শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

পার্বত্য জনপদের নতুন অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি: অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ থেকে ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৭:৪১ পিএম
পার্বত্য জনপদের নতুন অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি: অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ থেকে ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র

সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে নতুন করে সশস্ত্র সংঘর্ষ, অবরোধ ও সামরিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। পাহাড়ের এই হঠাৎ উত্তেজনার পেছনের দীর্ঘমেয়াদী ইতিহাস, অভ্যন্তরীণ সংঘাত, সামরিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির বিভিন্ন দিক নানা ভাবে আলোচিত হচ্ছে।

১. পাহাড়ে হঠাৎ উত্তাপ: ইতিহাস ও বর্তমান সংঘাতের পুনরাবৃত্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। অতীতে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এবং পরবর্তীতে ইউপিডিএফসহ বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই জনপদ বহুবার রক্তক্ষয়ী সংঘাত দেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি শিশুর ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনা নতুন রূপ নিয়েছে এবং দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় গোলাগুলি ও অবরোধের কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈরিতার বহিঃপ্রকাশ।

২. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জনমিতিক পরিবর্তন ৭-এর দশকের শেষের দিকে পাহাড়ি অঞ্চলে বাঙালি জনসংখ্যার অনুপ্রবেশ ঘটানোর মাধ্যমে সেখানকার জনমিতি ও স্থানীয় সংস্কৃতির ভারসাম্যে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। এর ফলে আদিবাসীদের সাথে বাঙালিদের এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তির মাধ্যমে অস্ত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

৩. সামরিক উপস্থিতি এবং আধিপত্য বিস্তারের কৌশল পাহাড়ে বর্তমান সামরিক তৎপরতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পাহাড়ে সামরিক মোতায়েন বৃদ্ধির ফলে ১৯৯৬ সালের পূর্ববর্তী পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে, যেখানে পর্যটক বা সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত ছিল। কোনো কোনো মহলের ধারণা, পাহাড়ে উত্তেজনা টিকিয়ে রেখে একটি বিশেষ সামরিক আধিপত্য বা কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রবণতা কাজ করছে।

৪. আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি: মিয়ানমার সংকট এবং বৈশ্বিক স্বার্থ

পার্বত্য অঞ্চলের বর্তমান অস্থিরতার পেছনে শুধু অভ্যন্তরীণ কারণই নয়, বরং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির গভীর প্রভাব রয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় চলমান সহিংসতা, আরাকান রোড ঘিরে নানা কার্যক্রম এবং বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এই জনপদকে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত স্বার্থ এবং এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তাকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

৫. জাতীয় রাজনীতি ও সরকারের ভূমিকা

বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের উদাসীনতা পাহাড়ের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন নিয়ে অতীতের পদত্যাগ এবং সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের স্পষ্ট বক্তব্যের অভাব জনমনে সন্দেহ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আসন্ন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ—বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য বা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার কৌশল হিসেবেও পাহাড়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্থিরতা তৈরি করা হতে পারে।

৬. সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যতের ঝুঁকি

পার্বত্য চট্টগ্রামের এই চলমান সংকটকে কেবল স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালি বা অভ্যন্তরীণ কোন্দল হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটিকে বাংলাদেশের সামগ্রিক স্বাধীনতা, অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বের ওপর একটি বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সময়মতো সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী পদক্ষেপ না নিলে এই ভূখণ্ডে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত আরও গভীর হতে পারে, যা সমগ্র দেশের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে।

শেষ কথা: পার্বত্য জনপদের শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় স্তরে সর্বোচ্চ সতর্কতার বিকল্প নেই।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন:

সম্পর্কিত সংবাদ