শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

তারেক রহমানের জাপান সফর ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা: আস্থার সংকট এবং 'বিগ-ব্যাগ' উদ্যোগ এবং ভারত-বাংলাদেশ সংযোগের ভূরাজনীতি

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৩:৫২ পিএম
তারেক রহমানের জাপান সফর ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা: আস্থার সংকট এবং 'বিগ-ব্যাগ'  উদ্যোগ এবং ভারত-বাংলাদেশ সংযোগের ভূরাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনের পরিবর্তনের ধারায় ফের এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক অস্বস্তির চিত্র সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে কেন্দ্র করে টোকিওতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ দাউদ আলীকে হুট করে প্রত্যাহার এবং তার নেপথ্যের কারণগুলো দেশের কূটনীতিতে এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সফর দোরগোড়ায়, তখন এমন সিদ্ধান্ত প্রশাসনের ভেতরের নীতিনির্ধারণী বিশৃঙ্খলা ও আস্থার সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

১. রাষ্ট্রদূত অপসারণ ও প্রশাসনের অভ্যন্তরে আস্থার সংকট

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের ঠিক প্রাক্কালে রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ দাউদ আলীকে জরুরিভিত্তিতে ঢাকায় তলব করা এবং তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর সফরে অংশ নিতে নিষেধ করার ঘটনাটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বর মাসে টোকিওতে জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের সঙ্গে রাষ্ট্রদূত দাউদ আলীর একটি বৈঠককে কেন্দ্র করেই এই সন্দেহ ও ক্ষোভের জন্ম।

সরকার গঠনের পর থেকেই প্রশাসন, পুলিশ ও কূটনৈতিক কোরে রাজনৈতিক আনুগত্য যাচাই এবং পুনর্বিন্যাসের যে প্রক্রিয়া চলছে, তা এখন চরমে পৌঁছেছে। এর আগে যুক্তরাজ্যে সাবেক হাইকমিশনার আবিদা ইসলামকে প্রত্যাহারের ঘটনার মধ্য দিয়ে যে ধারাবাহিকতার সূচনা হয়েছিল, রাষ্ট্রদূত দাউদ আলীর অপসারণ তারই আরেকটি দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ।

বর্তমান সরকারের ভেতরে প্রশাসনে সঠিক বিশ্বাসের লোক খুঁজে পাওয়ার এই অনাস্থা এবং অতি-সতর্কতামূলক অবস্থান শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক পেশাদারিত্বকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। রাষ্ট্রদূত অনুপস্থিত থাকায় প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি তদারকির জন্য শেষ মুহূর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ নজরুল ইসলামকে টোকিওতে পাঠাতে হয়েছে, যা প্রশাসনিক অগোছালো অবস্থারই পরিচায়ক।

২. জাপানের 'বিগ-ব্যাগ' (BIG-B) উদ্যোগ এবং ভূকৌশলগত সমীকরণ

এই সফরটি কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের খাতিরেই নয়, বরং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী এবং তাদের প্রস্তাবিত বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (BIG-B) উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো—বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে একটি অভিন্ন সাপ্লাই চেইন ও অর্থনৈতিক করিডোরের আওতায় আনা।

জাপান সরকারের পরিষ্কার বার্তা হলো, বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে এককভাবে কোনো দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে আঞ্চলিক আন্তঃসংযোগ ও পারস্পরিক আস্থার ওপর তারা বেশি জোর দেয়। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে জাপানি বিনিয়োগের পরিমাণ ইতোমধ্যে বিপুল আকার ধারণ করেছে। ফলে, মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিভিক (FOIP) অঞ্চলের বৃহত্তর লক্ষ্যের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক এবং সীমান্ত সংযোগ স্থাপনে সহযোগিতা অপরিহার্য বলে মনে করে টোকিও।

৩. পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থবিরতা ও নীতিনির্ধারণী শূন্যতা

রাষ্ট্রদূত হটিয়ে দেওয়ার এই অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ও হুট করে লোক বদলের কূটনীতি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনের সুবাদে এবং অভ্যন্তরীণ নানা সমীকরণে প্রধানমন্ত্রী এই সফরে আদৌ তাঁর সঙ্গে থাকবেন কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

রাষ্ট্রদূতহীন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতির মতো পরিস্থিতিতে জাপান সরকারের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও ভূকৌশলগত প্রস্তাবগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন ও জবাব তৈরি করা বর্তমান প্রশাসনের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৪. ভবিষ্যৎ আশঙ্কা তারেক রহমানের পূর্ববর্তী চীন সফর কাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট কৌশলগত রূপরেখার অভাব অন্যতম কারণ ছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত বাস্তবতায় জাপান অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ভারতকে যুক্ত করে বিগ-ব্যাগ (BIG-B) প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের জোরালো অংশগ্রহণ চায়।

শেষ কথা :

এই পরিস্থিতিতে যদি বাংলাদেশ সরকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সন্দেহ-অবিশ্বাসের বেড়াজাল ভেঙে একটি স্পষ্ট, সুসংহত ও দূরদর্শী বৈদেশিক নীতির অবস্থান ঠিক করতে না পারে, তবে ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ এবং জাপানের মতো বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে অংশীদারিত্বের প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে উঠবে। শেষ পর্যন্ত অপরিকল্পিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সুনির্দিষ্ট কৌশলগত দিশার অভাব থাকলে এই সফরও একটি কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে ব্যর্থ হতে পারে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: