মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

ট্রাম্পকে তোয়াজ করতে গিয়ে ইউরোপের বিষনজরে বাংলাদেশ: এবার ২৪ হাজার কোটি টাকার চরম খেসারতের মুখে তারেক সরকার? বঙ্গবন্ধুর নীতিতেই মিলবে বৈশ্বিক টানাটানির সমাধান

লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন। প্রকাশিত: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২:৫৬ পিএম
ট্রাম্পকে তোয়াজ করতে গিয়ে ইউরোপের বিষনজরে বাংলাদেশ: এবার ২৪ হাজার কোটি টাকার চরম খেসারতের মুখে তারেক সরকার? বঙ্গবন্ধুর নীতিতেই মিলবে বৈশ্বিক টানাটানির সমাধান

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সন্তুষ্টি অর্জনের মরিয়া কূটনৈতিক কৌশলে বাংলাদেশকে এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭টি দেশের সঙ্গে এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সংঘাতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হওয়া বোয়িং ও এয়ারবাসের টানাটানি এখন নিছক দুটি মার্কিন ও ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জন্য এক পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক ও বাণিজ্য যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।

শেখ হাসিনার আমলে এয়ারবাসের চুক্তি ও মার্কিন মার্কিন পথ রোধ

২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাব ও তৎকালীন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞার পর তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারী কেনাকাটা এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তখনকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বিমানের বাজার ধরে রাখতে ব্যাপক তৎপরতা চালালেও তা ব্যর্থ হয়। ২০২৩ সালের মে মাসে লন্ডনে যৌথ ঘোষণাপত্র সইয়ের মাধ্যমে ফ্রান্সের তৈরি ১০টি এয়ারবাস কেনা এবং যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় অংশীদারদের ইউকে এক্সপোর্ট ফাইন্যান্স (UKEF) স্কিমের আওতায় সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ পাওয়ার কথা নিশ্চিত হয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ঢাকা সফরে এসে স্বয়ং এই অগ্রগতির প্রশংসা করেছিলেন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মোড় পরিবর্তন ও ইউরোপের কড়া সতর্কতা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতে এবং মার্কিন বাণিজ্য কৌশল টিকিয়ে রাখতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইউরোপীয় কন্সোর্টিয়ামের পরিবর্তে আমেরিকার বোয়িং কেনার দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা বশিরউদ্দিন ২৫টি বোয়িং কেনার প্রতিশ্রুতি পর্যন্ত দিয়েছিলেন, যার ব্যাপারে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষও অন্ধকারে ছিল।

এই সিদ্ধান্তের পর ইউরোপের চার প্রভাবশালী রাষ্ট্রদূত—ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং ইইউর প্রতিনিধি একযোগে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। গত বছরের ২৬ নভেম্বর জার্মানির রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লর্ডস স্পষ্ট সতর্কবাণী দিয়েছিলেন যে, এয়ারবাসের চুক্তি বাতিল করলে বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য নির্ধারিত ‘জিএসপি প্লাস’ (GSP+) সুবিধা ও ভবিষ্যৎ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতালি থেকে ‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ যুদ্ধবিমান কেনার খসড়া প্রস্তাব ও আশ্বাসের কৌশল নেওয়া হলেও ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোকে তা নিরস্ত করতে পারেনি।

তারেক রহমানের বোয়িং প্রীতি ও ট্রাম্পের চিঠি

নির্বাচনে জয়ের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ইউনুস সরকারের দেখানো পথেই হাঁটতে শুরু করে। গত ৩০ এপ্রিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বোয়িংয়ের মধ্যে ৩.৭ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৫,৪০৮ কোটি টাকা) ব্যয়ে ১৪টি বোয়িং কেনার মূল চুক্তি সম্পন্ন হয়। ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গোরের এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্ট থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ আরও ১১টি বোয়িং কেনার বিষয়ে রাজি হয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতও সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেন যে, মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুরোধ ও আবদার রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর জবাবে ট্রাম্প স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি দিয়ে ধন্যবাদ জানান এবং লেখেন, "বোয়িং আপনাকে হতাশ করবে না।"

ঢাকায় ২৭ রাষ্ট্রদূতের যৌথ ঘেরাও: বিরল কূটনৈতিক মহড়া

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বাণিজ্যিক কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে ইইউর ২৭টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও শীর্ষ প্রতিনিধিরা একযোগে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠকে বসা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। সাধারণত সরকারপ্রধানের বাইরে কোনো একক মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীর সঙ্গে গোটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের মিশনপ্রধানদের এভাবে বৈঠক করার নজির নেই।

বৈঠক শেষে ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার অত্যন্ত কড়া সুরে জানান, সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' বা সমান সুযোগ দিতে হবে এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের বাণিজ্যিক যোগ্যতার বিচার করা উচিত। ইইউর পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে— আমেরিকার কাছ থেকে বোয়িং কেনায় তাদের আপত্তি নেই, কিন্তু ইউরোপের সঙ্গে করা চুক্তি ভাঙা হলে বাংলাদেশ বাণিজ্য ক্ষেত্রে মারাত্মক পরিণতি ভোগ করবে।

পোশাক খাতে বড় ধাক্কা ও চরম অনিশ্চয়তা

রাজনৈতিক তোয়াজের এই অসম লড়াইয়ে প্রধান বলি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পোশাক শিল্প। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আশঙ্কাজনকভাবে ১৯% কমে গেছে। অথচ এ সময়ে ভারতের সঙ্গে ইইউর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে এবং তারা বাজার দখল করছে।

ইউরোপের বাজারে কোটা ও শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিল কিংবা জিএসপি প্লাস হাতছাড়া হলে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত মুখ থুবড়ে পড়বে। একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে অর্থ বরাদ্দের অভাব, অন্যদিকে লোকসানি রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইন্সের বহর ভারী করতে কোটি কোটি ডলারের মার্কিন তোয়াজ—সব মিলিয়ে তারেক রহমানের সরকার এখন এক কঠিন উভয়সংকটে। ট্রাম্পের আবদার মেটাতে গিয়ে কোটি কোটি ইউরোপীয় ক্রেতার বিশাল বাজার হাতছাড়া হলে তার চরম খেসারত কাকে দিতে হবে, সেই উত্তরই এখন খুঁজছে ওয়াকিবহাল মহল।

ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই এখন পরিত্রাণের পথ: জাতির পিতার সেই কালজয়ী দর্শনেই ফিরতে হবে বাংলাদেশকে

বর্তমান বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বোয়িং ও এয়ারবাসকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে যে কূটনৈতিক টানাটানি তৈরি হয়েছে, তা দেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতিকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই অস্থিতিশীল ও জটিল আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার অনুসৃত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিই বাংলাদেশের একমাত্র ভরসা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মূলনীতি—‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’—এই অবস্থানের ওপর দৃঢ় থাকাই এখন বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট শক্তিকে তোয়াজ না করে সার্বভৌমত্ব ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করে চলাই এই মুহূর্তে সময়ের দাবি।

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।